kalerkantho

নরসিংদীতে বাউল মেলা

মুখরিত মেঘনা তীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মুখরিত মেঘনা তীর

নরসিংদীতে চলছে সপ্তাহব্যাপী বাউল মেলা। বাউলরা গতকাল বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মানবধর্ম ও সাম্যের জয়ধ্বনি করছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

একদল বাউল সাধক দোতারা ও ঢোলের তালে সংগীত পরিবেশন করছেন। তবে তা প্রথাগত কোনো সংগীত নয়, মানবতার গান। এ গান কোনো পুঁথিতে লিপিবদ্ধ নেই। কয়েক শ বছর ধরে গুরুর সঙ্গে আরাধনা করে শিষ্যরা এ গান আয়ত্ত করেছেন। বাউল ভক্তদের পাশাপাশি অনেকেই এ আসরে যোগ দিয়েছেন।

নরসিংদী শহরের মেঘনা নদীর তীরে ভক্ত ও পুণ্যার্থীর ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা। মেলায় ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কয়েক শ বাউল সাধক যোগ দিয়েছেন। বাউলরা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মানব ধর্ম ও সাম্যের জয়ধ্বনী করছেন।

বাউল সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রায় সাত শ বছর ধরে মাঘী পূর্ণিমা তিথীতে শহরের কাউরিয়াপাড়ার শ্রীশ্রী বাউল ঠাকুরের আখড়ায় এ মেলার আয়োজন করা হয়। গত সোমবার শুরু হওয়া বাউল মেলা চলবে আগামী সোমবার পর্যন্ত। গতকাল শুক্রবার দেবতা ব্রহ্মার পূজা মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়।

মহাযজ্ঞ পরিচালনা করেন পুরোহিত সাধন বাউল। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সব ধর্মকে মানবতার ঊর্ধ্বে তোলার জন্যই বাউল ঠাকুরের আবির্ভাব হয়েছিল। তাই বাউল মেলায় বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ অংশ নেয়। মহাযজ্ঞে জগতের কল্যাণের জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের পূজা করা হয়। ঠাকুরের কাছে দেশ ও মানুষের কল্যাণে প্রার্থনা করা হয়।

মহাযজ্ঞে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেয়। মেলায় আসা ভক্তরা মনোবাসনা পূরণে বাউল ঠাকুরের সমাধিতে প্রদীপ প্রজ্বলন করে। তা ছাড়া নিজেদের মঙ্গল চেয়ে প্রার্থনা করেন।

কুমিল্লার মনোহরপুর থেকে আসা পল্লবী ঘোষ বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, বাউল ঠাকুর জাগ্রত। বাউল ঠাকুর মনের ঠাকুর। মনে-প্রাণে ডাকলেই ঠাকুরকে পাওয়া যায়। তাই নিজের ও সন্তানের মঙ্গল কামনায় ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি। ’

মেলায় শ্রীমঙ্গল থেকে আসা শংকর লাল পোদ্দার বলেন, ‘যুগ যুগ ধরেই আমাদের পরিবারের লোকজন বাউল মেলায় আসছে। বাউল ঠাকুরের উদ্দেশে এটি মিলনমেলায় পরিণত হয়। ’

বাউল সাধকরা জানান, এ আখড়ায় বাউল ঠাকুরের অন্তর্ধান হয়েছিল। বাউল আখড়ায় জগন্নাথ দেবতার মন্দির রয়েছে। মন্দিরে মহাবিষ্ণুর পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা, জগন্নাথ দেবতার প্রতিমা, মা গঙ্গার (৩৩ কোটি দেবতার) গট, নাগ দেবতার বিগ্রহ ও শিবলিঙ্গ রয়েছে, যা বাউল ঠাকুর নিজে প্রতিস্থাপন করে গেছেন বলে কথিত রয়েছে। পাশে রয়েছে বাউল ঠাকুর ও মাতাজির সমাধি মন্দির। সবার মধ্যিখানে রয়েছে উপাসনার জন্য বিশাল আটচালা বৈঠক ঘর।

সেই ঘরেই দেশ-বিদেশের বাউল সাধকরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠকে মিলিত হচ্ছে। আখড়ার বৈঠক প্রচলিত বৈঠকের মতো নয়। এ বৈঠকে কেউ কথা বলেন না। শুধু সাধকের গাওয়া গানের মর্মার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়।

কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে আসা বাউলভক্ত সুধীর চন্দ্র শীল বলেন, “জীবের মঙ্গলার্থে বাউল ঠাকুরের আবির্ভাব হয়েছিল। কিভাবে সহজে মানুষ নিজেকে চিনতে পারবে সেই পথ তিনি দেখিয়ে গেছেন।


মন্তব্য