kalerkantho


বরগুনার পিআইওর কারসাজি

জাল পেঅর্ডার, ১৩ কোটি টাকার টেন্ডার

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জাল পেঅর্ডার, ১৩ কোটি টাকার টেন্ডার

পিআইও মো. ইসরাফিল

এক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কারসাজিতে ‘ধরা’ খেলেন বরগুনার তিন শতাধিক ঠিকাদার। জাল পেঅর্ডার জেনেও তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলা দিয়ে পিআইও মো. ইসরাফিল ১৩ কোটি টাকার কাজের দরপত্র চূড়ান্ত করেছেন।

কর্তৃপক্ষ আর সরকারি ক্রয় নীতিমালাকে (পিপিআর) বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোটি টাকার উেকাচ নিয়ে এই অপকর্ম করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত পিআইও মো. ইসরাফিল।

সদর উপজেলা পিআইও অফিস সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুধু বরগুনা সদর উপজেলার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২২টি গ্রুপে (কাজ) গ্রামীণ সড়কে ছোট ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর দরপত্র জমাদানের শেষ তারিখে ওই ২২ উন্নয়নকাজের অনুকূলে মোট দুই হাজার ৪৩৮টি দরপত্র জমা পড়ে। এসব দরপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত পে-অর্ডারের (প্রতিটি ৪৩ হাজার, ৮০ হাজার টাকা ইত্যাদি অঙ্কের) বেশির ভাগই জাল ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। অথচ সেসব পেঅর্ডার যাচাই-বাছাই ছাড়াই গত সোমবার সদর উপজেলার ইউএনও আজহারুল ইসলামের উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে কাজ বণ্টন করা হয়। জাল পে-অর্ডারের বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে ইউএনওর কাছে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেন একাধিক ভুক্তভোগী ঠিকাদার। বরগুনার পূবালী ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ২৭ নভেম্বর পূবালী ব্যাংক থেকে পৃথকভাবে ২০টির বেশি ১০ টাকার পেঅর্ডার কাটে (করে) একটি চক্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরে ওই সব পেঅর্ডার স্ক্যান করে প্রতিটিতে হাজার হাজার টাকার অঙ্ক বসিয়ে জাল পেঅর্ডার তৈরি করে চক্রটি। আর এগুলো ব্যবহার করা হয় দরপত্রে।

ঠিকাদার মিজানুর রহমান রিয়াজের অভিযোগ, পিআইও মো. ইসরাফিলের সঙ্গে যোগসাজশে সদর উপজেলার ১, ২, ১২ ও ১৯ নম্বর কাজের (গ্রুপ) এক কোটি ১৩ লাখ টাকার চারটি কাজ পেয়েছেন শহরের ডিকেপি সড়কের স্থানীয় বাসিন্দা ঠিকাদার মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি তাঁর দরপত্রের সঙ্গে যে পেঅর্ডার সংযুক্ত করেছেন তা সবই ছিল জাল। তাঁর ব্যাংক স্টেটমেন্টও বানোয়াট। দরপত্র আহ্বানের নিয়মানুযায়ী এসব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা থাকলেও পিআইও ইসরাফিল মোটা অঙ্কের উেকাচ নিয়ে তা করেননি। ঠিকাদার রিয়াজ বলেন, শুধু মোস্তাফিজুর রহমানই নন, জাল পেঅর্ডার ব্যবহার করে সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলার অনেক কাজ হাতিয়ে নিয়েছে একটি সিন্ডিকেট।    

পূবালী ব্যাংক বরগুনা শাখার ব্যবস্থাপক মো. রুহুল আমিন গত মঙ্গলবার বিকেলে বরগুনা প্রেস ক্লাবে একটি লিখিত সংবাদ বিবরণীতে জানান, কতিপয় প্রতারকচক্র অল্প টাকার পেঅর্ডার কেটে তা স্ক্যান করে কালার প্রিন্টের মাধ্যমে বেশি টাকার অঙ্ক বসিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ব্যবহার করে আসছে। এটি ব্যাংকের সুনাম নষ্ট করতে পারে। তবে গত ২৭ নভেম্বর এক দিনে পূবালী ব্যাংক থেকে কে বা কারা ১০ টাকার একাধিক পেঅর্ডার নিয়েছে তা জানতে চাইলে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি কিছু বলতে চাননি।

ভুক্তভোগী একাধিক ঠিকাদার জানান, সরকারি ক্রয় নীতিমালা ও দরপত্র সম্পাদনের শর্ত অনুযায়ী মোট মূল্যের শতকরা তিন ভাগ অর্থের নগদ পেঅর্ডার সংযুক্ত করে দরপত্র জমা দিতে হয়। কিন্তু একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারচক্র পিআইও ইসরাফিলের সঙ্গে যোগসাজশে জাল পেঅর্ডার সংযুক্ত করে সব কাজের দরপত্রে অংশ নেয়। ঠিকাদার নাসরিন সুলতানা পলি বলেন, বরগুনার ছয়টি উপজেলায় একযোগে ভিন্ন ভিন্নভাবে এসব দরপত্র আহ্বান করা হয়। একজন ঠিকাদার যদি সব কটি গ্রুপের দরপত্রে অংশ নেন, তবে তাঁকে ৬৫ লাখ টাকার পেঅর্ডার কাটতে হবে। অথচ একটি ঠিকাদারচক্র তা না করে জাল পেঅর্ডার সংযুক্ত করে জেলার সব কটি গ্রুপের দরপত্রে অংশ নিয়ে লটারির মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেয়। এতে সরকার ও সাধারণ ঠিকাদাররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বরগুনা জেলা ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রতিটি দরপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত পে-অর্ডারের ব্যাংক ও সিরিয়াল নম্বর লিখে রাখার নিয়ম থাকলেও পিআইও ইসরাফিল রাখেননি। জাল পে-অর্ডারের তথ্য গোপন করার অসৎ উদ্দেশ্যেই সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ কাজ করেছেন ইসরাফিল। এটি সরকারি ক্রয় নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।  

সূত্র জানায়, সদর উপজেলার পিআইও রণজিৎ কুমার সরকার দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে গেলে আমতলী ও তালতলী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পিআইও মো. ইসরাফিলকে সদর উপজেলারও দায়িত্ব দেওয়া হয়। এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নানা অপকৌশলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অসাধু ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উেকাচ নিয়ে স্বল্প সময়ে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন পিআইও ইসরাফিল। তালতলী উপজেলার দায়িত্বে থাকাকালে টিআরের (টেস্ট রিলিফ) বিশেষ বরাদ্দ থেকে কড়ইবাড়িয়া ইউনিয়নের বেহালা গ্রামে তিনটি মন্দিরকে ১৩টি দেখিয়ে এর উন্নয়নে প্রায় ১০ লাখ টাকা এবং ২৫টি মসজিদ উন্নয়নের নামে প্রায় ১৫ লাখ টাকা কোনো কাজ না করেই আত্মসাৎ করেন ইসরাফিল। এ ছাড়া ছোটবগী, কড়াইবাড়িয়া ও পচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নের একাধিক কার্পেটিং সড়কে মাটির কাজ দেখিয়ে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন সরকারের কোটি টাকা।   

বর্তমানে বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পিআইও মো. ইসরাফিল সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জাল পে-অর্ডারের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেসব ঠিকাদার কাজ পেয়েছেন তাঁদের জমা দেওয়া পেঅর্ডার সঠিক ছিল কি না যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। তবে দরপত্রের সঙ্গে দেওয়া পে-অর্ডারের তথ্য কেন লিপিবদ্ধ করা হয়নি—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সময়ের অভাবে তা করা হয়নি।

সদর উপজেলার ইউএনও আজহারুল ইসলাম বলেন, কেন সব দরপত্রের তুলনামূলক স্টেটমেন্টের সময় পেঅর্ডার সংক্রান্ত তথ্য লিখে রাখা হয়নি সে বিষয়ে তিনি পিআইও ইসরাফিলকে জিজ্ঞেস করেছেন। ইসরাফিল এর সদুত্তর দিতে পারেননি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

 


মন্তব্য