kalerkantho


তিস্তার বুকে ‘বোমা মেশিন’ ঝুঁকিতে দ্বিতীয় সড়ক সেতু

স্বপন চৌধুরী, রংপুর ও হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তিস্তার বুকে ‘বোমা মেশিন’ ঝুঁকিতে দ্বিতীয় সড়ক সেতু

নির্মাণাধীন দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর গা ঘেঁষে নিষিদ্ধ বোমা মেশিনে বালু তোলা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ছয় সিলিন্ডারযুক্ত নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে নির্বিঘ্নে বালু তোলা হচ্ছে তিস্তা নদী থেকে। এ অবস্থায় নির্মাণাধীন দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রয়েছে ঝুঁকিতে। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ ও রংপুরের গঙ্গাচড়ার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নির্মাণাধীন এ সেতু নিয়ে এলাকাবাসী উদ্বিগ্ন। তবে বালু উত্তোলনের এ ‘কর্ম’ চালিয়ে যেতে প্রকৌশলীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও ‘সায়’ রয়েছে বলে জানা গেছে। সে কারণেই ঠিকাদার অবৈধ পন্থায় বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নির্মাণাধীন সড়ক সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নদীর বুকে গর্ত করে বসানো হয়েছে পাইপ। আর এর ওপরে লাগানো হয়েছে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘বোমা মেশিন’। বালু উত্তোলনে এ ধরনের মেশিন ব্যবহারে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন ২০১৩ সালে। সেতুর মহিপুর অংশের ৫ নম্বর স্প্যান থেকে এ মেশিনের দূরত্ব মাত্র দেড় শ গজ। ওই মেশিন দিয়ে উত্তোলনকৃত বালু পাইপের মাধ্যমে গিয়ে পড়ছে নির্মাণাধীন সেতুটির দক্ষিণ প্রান্তের শুরুর অংশে। জমা করা বালু ট্রাকে করে নিয়ে ফেলা হচ্ছে মহিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকার অ্যাপ্রোচ সড়কের দুই পাশে।

মহিপুরের বাসিন্দা মোশারফ হোসেন বলেন, বেশ কিছুদিন আগে দুটি মেশিন দিয়ে বালু তোলা শুরু হয় নদীর গভীর থেকে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগে একটি মেশিন সরিয়ে নেওয়া হয়। সেতু ও নদীর ক্ষতি করে বড় মেশিন দিয়ে তোলা হচ্ছে বালু।

বালু পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকচালক হারুন জানান, আলমগীর হোসেন নামের ঠিকাদারের হয়ে কাজ করছেন তাঁরা। তিস্তা নদী থেকে তোলা বালু ফেলছেন সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার আলমগীর হোসেনের সঙ্গে সেতু ও সড়ক নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা কালিগঞ্জের এক প্রকৌশলীর রয়েছে বিশেষ সখ্য। সম্প্রতি বোমা মেশিন বন্ধে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযান চালালে পারভেজ নেওয়াজ নামের প্রকৌশলী তাঁকে নানা যুক্তি দেখিয়ে ফেরত পাঠান।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ঠিকাদার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তিস্তার চর থেকে বালু উত্তোলনে কোনো বাধা নেই। নানা কারণে সেতুর কাজ অনেক পিছিয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। নদীর বালু উত্তোলন ছাড়া এখন বিকল্প নেই। গঙ্গাচড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি সরেজমিনে দেখেছেন এবং নদী বেশি গভীর করতে নিষেধ করেছেন। ’

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান বলেন, ‘বোমা মেশিনে বালু তোলা নিষিদ্ধ নয়। বালু তোলার মাধ্যমে এক ধরনের ‘ড্রেজিং’ চলছে। সেতু এলাকায় অবশ্যই ড্রেজিং করতে হবে। সেতুর কাজের জন্য নদী থেকে বালু তোলা দোষের কিছু নয়। পানির উপরিভাগ থেকে আড়াই মিটার গভীর পর্যন্ত বালু উত্তোলনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বাধা নেই। ’

এদিকে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদী ড্রেজিং করা আর নদী থেকে মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন এক কথা নয়। নদী থেকে বালু তোলা যাবে, তবে বোমা মেশিন দিয়ে কিংবা সেতুর গা ঘেঁষে বালু তোলা মোটেও ঠিক নয়। সরেজমিনে গিয়ে তাদের এভাবে বালু উত্তোলনে নিষেধ করা হয়েছে। ’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান বলেন, ‘চলতি বছরেই তিস্তা নদী ড্রেজিং করার পরিকল্পনা আছে। সে ক্ষেত্রে নদী থেকে বালু তোলায় এক ধরনের ড্রেজিংয়ের কাজ হচ্ছে। ঠিকাদার বালু উত্তোলনে বেশি গভীর করছেন না। এতে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। ’

সম্প্রতি মাহবুবর রহমান এক চিঠিতে লালমনিরহাটে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর যে বালুর চর রয়েছে সেখান থেকে বালু উত্তোলনপূর্বক অ্যাপ্রোচ নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে কিভাবে বালু উত্তোলন করা হবে সে বিষয়ে চিঠিতে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। নির্মাণাধীন সেতুর পশ্চিম দিকে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পয়েন্ট চিহ্নিত করে একটি নকশাও যুক্ত করা হয়েছে চিঠির সঙ্গে।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল একনেক সভায় তিস্তা নদীর ওপর গঙ্গাচড়া-কালীগঞ্জ সড়ক সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে এটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ্য মূল সেতুর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩১ কোটি টাকা। এটি নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ‘ডাব্লিউএমসিজি-নাভানা গ্রুপ’। এ ছাড়া কালীগঞ্জের কাকিনা থেকে গঙ্গাচড়ার মহিপুর ঘাট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সংযোগ সড়কের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি টাকা এবং ওই সংযোগ সড়কে তিনটি কালভার্ট ও দুটি ছোট সেতুর নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। তিন দফা সময় বাড়ানোর পরও সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। সর্বশেষ বাড়িয়ে নেওয়া চার মাস সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্টরা তড়িঘড়ি কাজ শেষ করতে চাচ্ছে।


মন্তব্য