kalerkantho

পোড়াদহের মেলা

লাখ টাকার বাঘাইড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



লাখ টাকার বাঘাইড়

বগুড়ার গাবতলীতে পোড়াদহ মেলায় ৮২ কেজি ওজনের এই বাঘাইড় মাছের দাম হাঁকা হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার টাকা। ছবি : ঠাণ্ডা আজাদ

বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহের মেলার এবারের আকর্ষণ ছিল লাখ টাকার বাঘাইড় মাছ। ৮২ কেজির এই মাছটি এক হাজার ৫০০ টাকা কেজি দাম চাওয়া হলেও এক হাজার ৪০০ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি হয়েছে। এ হিসেবে মাছটির দাম দাঁড়ায় এক লাখ ১৪ হাজার ৮০০ টাকা। এ ছাড়া মেলায় আসা একটি মিষ্টির ওজন ছিল ২০ কেজি। গতকাল বুধবার বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় দেড় শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা শুরু হয়। গভীর রাত পর্যন্ত চলে মেলায় মাছ বেচাকেনা। মেলার প্রথম দিন জামাইবরণ ও দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার বউমেলার মধ্যে দিয়ে শেষ হবে।

পোড়াদহ মেলার প্রথম দিনে পুরুষদের ভিড়ের কারণে নারীরা যেতে পারে না। এ কারণে পরের দিন তাদের জন্য হয় বউমেলা।

গতকাল বড় বাঘাইড় মাছটি নিয়ে এসেছিলেন গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামের ব্যবসায়ী দুখু মিয়া। রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে আনা মাছটি পদ্মা নদীর বলে তিনি জানান।

মেলায় উঠেছে ২৫ কেজি ওজনের বোয়াল, ৪৫ কেজির কাতল, ২২ কেজির রুই ও ১৮ কেজির পাঙ্গাশ। এ ছাড়া পাঁচ থেকে ১৫ কেজি ওজনের রকমারি মাছের ছড়াছড়ি ছিল। গত মঙ্গলবার রাত থেকে ট্রাকে করে মাছ নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে যায় ক্রেতারা। সেখানে বড় বড় চৌবাচ্চা তৈরি করা হয়। তাতে জীবন্ত মাছ দেখে পছন্দ করে কিনে নেয় ক্রেতারা।

স্থানীয় লোকজন জানায়, প্রায় দেড় শ বছর আগে বগুড়া-চন্দনবাইশা সড়কসংলগ্ন পোড়াদহ খালের পাড়ে এক বিশাল বটগাছের নিচে আয়োজন করা হতো সন্ন্যাসী পূজার। প্রতি বছরের মাঘ মাসের শেষ বুধবার আয়োজন করা হতো। কালের বিবর্তনে তা হয়ে ওঠে পূর্ব বগুড়াবাসীর মিলনমেলা। পোড়াদহ নামক স্থানে হয় বলে এর নাম হয়ে যায় পোড়াদহ মেলা। মেলাকে ঘিরে আশপাশে প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ মেয়ে ও জামাইকে নিমন্ত্রণ দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। তাদের সঙ্গে নিমন্ত্রণ দিয়ে থাকে স্বজনদেরও। ইছামতী নদীতীরবর্তী এ মেলায় দিন দিন নানা প্রজাতির মাছের আমদানি বাড়তে থাকে। এক সময় তা মাছের মেলা হিসেবে পরিচিতি পায়। খোলা মাঠে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ ঘটে। মেলায় আসা মাছ বিক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের বড় মাছ বিক্রির প্রতিযোগিতা লেগে যায়। যে যত বড় মাছ মেলায় তুলতে পারবে, তার তত নামডাক। মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে মিষ্টি বিক্রেতারাও। গত কয়েক বছরে তাদের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

গত বছরের এই মেলাতে বড় একটি মিষ্টির ওজন ছিল ১৫ কেজি। এবার সেটি পাঁচ কেজি বাড়তি হয়ে ২০ কেজি করা হয়েছে। সৈয়দ আহম্মেদ কলেজ এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাকের দোকানে এ মিষ্টি বিক্রি হয়েছে আট হাজার টাকায়। এ ছাড়া এক কেজি, দুই কেজি, তিন কেজি, চার কেজি ওজনের মিষ্টিও মেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন নামে।

গাবতলী উপজেলার মড়িয়া গ্রামের মাছ বিক্রেতা ইসলাম জানান, এবারের মেলায় তিনি ৪০ কেজি ওজনের কাতল নিয়ে এসেছেন। দাম হেকেছেন দুই হাজার টাকা কেজি দরে ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ফার্নিচার, বড়ই, পান সুপারি, তৈজসপত্র ও খেলনা পাওয়া যায়।

এলাকাবাসী জানায়, মেলায় যেমন মাছের আকর্ষণ, তেমনি বাড়ি বাড়ি চলে জামাই আকর্ষণ। কোনো জামাই তাঁর শ্বশুরবাড়ির জন্য কত বড় মাছ কিনেছেন—তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। জামাইরা একে অন্যের বাড়ি বেড়াতে যান মিষ্টি হাতে। আবার জামাইদের হাতে বাড়ির বড়রা নগদ অর্থ তুলে দিয়ে থাকেন। সবাই সবার জন্য কেনাকাটা করে থাকেন। স্থানীয় লুত্ফর রহমান সরকার স্বপন বলেন, ‘গাবতলী উপজেলাসহ পাশের সোনাতলা, সারিয়াকান্দি, ধুনট, বগুড়া শহরের লাখো মানুষ এসেছে মেলায়। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদের পর এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। ’

মেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষের পদচারণ হয়ে থাকে এ মেলায়। আশপাশের ২০ গ্রামের মানুষের কাছে ঈদের পর এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। মেলাকে কেন্দ্র করে জামাই, মেয়েসহ আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া হয়। ’

গাবতলী মডেল থানার ওসি আ ন ম আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, ‘মেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ’


মন্তব্য