kalerkantho


বাবার বিচার চেয়ে ফারিয়া রাজপথে

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাবার বিচার চেয়ে ফারিয়া রাজপথে

মাকে কুপিয়ে বাবা পলাতক। মা হাসি হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়। বাবা রিপনকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে গতকাল রাজপথে দেখা যায় ছোট্ট শিশু ফারিয়াকে। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাহজাবিন ফারিয়া। চার বছর বয়সী এ ছোট্ট শিশুর জীবনে বইছে ঝড়।

এক রাতে বড় ভাই ফাহাদের (৬) সামনেই উপর্যুপরি কুপিয়ে মা মনিকা শারমিন হাসিকে রক্তাক্ত করে বাবা আবু নাসের ইলিয়াস রিপন। সেই রাতের বাবার নিষ্ঠুর আচরণ মেনে নিতে পারছে না তার শিশু মন। তখন থেকেই থেমে থেমে কেঁদে সময় কাটছে ফারিয়ার। মঙ্গলবার ‘নিষ্ঠুর’ বাবার বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছে শিশু ফারিয়াও। সেখানেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফারিয়া তার মাকে সুস্থ ফেরত চেয়েছে।

এদিকে সাত দিন পেরিয়ে গেলেও গৃহবধূ হাসির ওপরে নির্মম হামলা চালানো স্বামী রিপন ধরা পড়েনি। পরিবারের সবার আদরের হাসি এখনো হাসপাতালের বিছানায়। পুড়ো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়া। হাসির ছোট্ট দুই শিশু শুধু চোখের জল ফেলছে।

পরিচিত কাউকে পেলেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানতে চাইছে, ‘বাবা কেন মারল মাকে? আমার মা কি আর কথা বলবে না? মা আমাদের ডাকতেছে না কেন? মা খাচ্ছে না কেন?’

হাসির শিশুদের এত সব প্রশ্নের জবার নেই কারো কাছে। তাদের নানা হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘অবুঝ শিশু। সাদা মন। বাবার এমন নিষ্ঠুর আচরণ মেনে নিতে পারছে না। কী জবাব দেব আমি তাদের। মেয়েটা না বাঁচলে এই শিশুদের বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। দিন-রাত প্রার্থনা করছি আল্লাহ যেন হাসির প্রাণটা ভিক্ষা দেন। ’

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জন সুশান্ত পাল বলেন, ‘হাসির পেটের আঘাতে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে। মাথার আঘাত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। অবস্থার উন্নতি হয়েছে তা বলার সময় এখনো হয়নি। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। ’

মঙ্গলবার শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম বগুড়া জেলা শাখা হাসিকে হত্যাচেষ্টাকারী স্বামী রিপনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ফোরাম জেলা আহ্বায়ক দিলরুবা নূরী। এই মানববন্ধনে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে উপস্থিত ছিল হাসির মেয়ে মাহজাবিন ফারিয়া, ছেলে ফাহাদ ও ফুফু ফাহিমা। সেখানেই ছোট্ট শিশু ফারিয়া বলে, ‘আমার মা কথা বলছে না। আমার বাবা মাকে খুব মারছে। মার অনেক রক্ত বের হইছে। মা কবে আমার কাছে আসবে?’

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাসদ জেলা আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পল্টু, মহিলা ফোরাম সংগঠক রাধা রানী বর্মণ, সুমি রায়, মুক্তা আক্তার মীম, ছাত্র ফ্রন্ট জেলা সাধারণ সম্পাদক মাসুকুর রহমান।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, হাসিকে রামদা দিয়ে যেভাবে কোপানো হয়েছে তা যেকোনো বর্বরতাকে ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এই ঘটনার আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। বরং রিপনের পরিবার প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় নানাভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, যাতে এই ঘটনা নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি না করা হয়।

শিবগঞ্জ থানার ওসি শাহীদ মাহমুদ জানান, পুলিশ সুপারের নির্দেশনা তিনি পেয়েছেন। ইতিমধ্যেই মাদকাসক্ত রিপনের সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রিপনের পরিবারের একাধিক সদস্য জানায়, ঘটনার রাতে রিপন হাসিকে কুপিয়ে আহত করার পর তার সারা শরীর রক্তে ভিজে গিয়েছিল। দেড় ঘণ্টা ধরে রক্তাক্ত হাসি যখন ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিলেন তখন রিপন ও তার বাবা হবিবর রহমান ভেবেছিল হাসি মারা গেছে। এ কারণে হবিবর রহমান তার ছেলেকে গায়ের শার্ট ও পরনের প্যান্ট পরিবর্তন করে দিয়ে বাড়ির প্রাচীর টপকে পালাতে সহযোগিতা করে। এ কারণে হবিবর রহমানও এখনো পলাতক।


মন্তব্য