kalerkantho

যৌতুক যন্ত্রণা

আবার হাসুক হাসি

বগুড়ায় গৃহবধূর শরীরে রামদার ১৬ কোপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আবার হাসুক হাসি

স্বামী রিপনের অমানবিক নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত মনিকা শারমিন হাসি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। ইনসেটে হাসির হাসিমাখা মুখ। ছবি : কালের কণ্ঠ

নাম মনিকা শারমিন হাসি (২৮)। নামের সঙ্গে মিলিয়ে মুখে সব সময় স্বভাবসুলভ হাসি লেগে থাকত। সেই নারী পাঁচ দিন ধরে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন। স্বজনরা অপেক্ষা করছে তাঁর চেতনা ফেরার।

হাসি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সমবয়সী রিপনকে। তাঁর চোখে ছিল একরাশ স্বপ্ন। দুজন শপথ নিয়েছিলেন এ জন্মে কখনো আলাদা হবেন না। এটি আট বছর আগের কথা। আর এখন সব ভালোবাসা রূপ নিয়েছে ঘৃণায়। শরীরে স্বামীর রামদার ১৬টি কোপের ক্ষত।

শজিমেক হাসপাতালের চতুর্থ তলায় কথা হয় হাসির বাবা হান্নান চৌধুরীর সঙ্গে।

মেয়ের বিছানার পাশে নিশ্চুপ বসে আছেন তিনি। কাঁদতে ভুলে গেছেন। মেয়ের সারা শরীর সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার পরিহার গ্রামে তাঁর বাড়ি। পেশায় কৃষক। মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র মেয়েটি ভালোবেসেছিলেন প্রতিবেশী যুবক আবু নাসের ইলিয়াস রিপনকে (৩০)। রিপনের বাবা হবিবর রহমান ও মা সিদ্দিকা বানু ছিলেন স্কুল শিক্ষক। অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান রিপন-হাসির আট বছরের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। ছয় বছরের ফাহাদ ও চার বছরের ফারিয়া।

হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘মেয়ের কাছে শুনেছি, জামাই বদলে গেছে। ইয়াবা সেবন করে। বিগত চার বছরে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দোকানপাট, অটোরিকশা বিক্রি করে দেয় নেশার টাকা জোগাড় করতে। মেয়ের অল্প কিছু যা গয়নাগাটি ছিল সেগুলো বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছে। স্ত্রী কিংবা শিশুসন্তানদের ভবিষ্যতের কথা কখনো চিন্তা করেনি। এসব কাজে বাধা দিলে অমানুষিক নির্যাতন করত। ’ দুই বছর আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি জানান, যৌতুকের জন্য মেয়ের শরীরে গরম পানি ঢেলে দেন রিপন। সারা শরীর ঝলসে যায়। এরপর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করা হলে গ্রেপ্তার হন স্বামী। চার মাস জেল খেটে বের হওয়ার পর কিচক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরীর মুচলেকা দিয়ে স্ত্রীকে ঘরে ফিরিয়ে নেন। শিশুসন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সে সময় সবাই বিষয়টি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু রিপনের অভ্যাস পাল্টায়নি। নেশায় আসক্ত হয়ে তিনি প্রতি রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরতেন। মারধর করতেন স্ত্রীকে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রিপনের চাচাতো ভাই মিল্টন ও সোহেল বলেন, ‘গত মঙ্গলবার গভীর রাতে হাসির চিত্কারে ঘুম ভেঙে আমরা প্রাচীর টপকে বাড়িতে ঢুকি। তখনো মেঝেয় রক্তের স্রোত। অবুঝ দুই শিশুসন্তান ঘরের এক কোণে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে ছিল। আর স্ত্রীকে কুপিয়ে রক্তমাখা রামদাসহ রিপন পালিয়ে যায়। তার বাবা হবিবর রহমান ছেলেকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন। ’ মেয়ের বাবা এসে অচেতন মেয়েকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রায় আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে আইসিইউতে রাখা হয়।

হান্নান চৌধুরী জানান, ঘটনার পরদিন থানায় মামলা করেন। পুলিশ অজ্ঞাত কারণে আসামি ধরছে না। এমনকি ঘটনাস্থল পরিদর্শন পর্যন্ত করেনি। এদিকে রিপন অজ্ঞাত স্থান থেকে ফোনে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।

কিচক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘ভালো মনে করে হাসিকে পুনরায় স্বামীর ঘরে পাঠিয়েছিলাম। ঘরে ছোট ছোট সন্তান রয়েছে। রিপন মাফ চেয়ে মুচলেকা দিয়েছিল কখনো স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবে না। এখন যে কাজ করল, তাতে আইনই তাকে সাজা দেবে। ’

মামলা তদন্তকারী শিবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম বলেন, ‘তদন্ত করা হচ্ছে। আসামি পলাতক। তাকে পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে। ’

শজিমেক হাসপাতালের নিউরো সার্জন সুশান্ত পাল বলেন, হাসির অবস্থা ভালো নয়। মাথা ও গলার ক্ষত মারাত্মক। এখন সৃষ্টিকর্তাই পারেন তাঁকে নতুন জীবন দিতে।


মন্তব্য