kalerkantho


মহালছড়িতে ট্রাকচাপায় নিভল আট প্রাণ

চোংড়াছড়ি গ্রামে মাতম

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মহালছড়ির চোংড়াছড়ি গ্রামে চলছে মাতম। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত স্বজন ও এলাকার মানুষের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

শোকাহত সবার একটাই কথা, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সমবেদনার চাপে যাতে জড়িতরা পার পেয়ে না যায়। এদিকে শনিবার বিকেলে দুর্ঘটনায় নিহতদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়। জেলাজুড়ে বিহার, কেয়াং আর বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনা করা হয়। শুক্রবার খাগড়াছড়ির আলুটিলায় চন্দ্রমনি মহাস্থবিরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে এসে ট্রাকচাপায় নিহত হয় শিশু-নারীসহ আটজন। নিহত অন্য দুজনের বাড়ি মাটিরাঙ্গার তবলছড়ি ও রামগড়ের পাগলাপাড়ায়। সেখানেও নিহতদের লাশ দাহ করা হয়েছে।

শনিবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছিমছাম গ্রাম চোংড়াছড়ি। উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরের গ্রামটি প্রায় শতবর্ষী।

অন্য দশটি দিনের সঙ্গে যেন কোনোভাবেই মেলানো যাচ্ছিল না এই গ্রামের মানুষকে। গোটা গ্রামের মানুষ এখন শোকে পাথর। কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই।

নিহত নেইম্রা মারমার শ্বশুর থোয়াই অংগ্য মারমা বলেন, ‘আমি সব হারিয়েছি। আর কারো কপালে যেন এমন না ঘটে। ’ চালক চাইলাগ্য মারমা এতটাই বাকরুদ্ধ যে তিনি কিছুই বলতে পারছিলেন না। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তাঁর স্ত্রী নেইম্রা, অষ্টম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে ববি মারমা ও প্রথম শ্রেণিতে পড়া নুনু মারমা টুনটুনি ওই ঘটনায় নিহত হয়। তিনি শুধু বলেন, ‘আমি আর কী নিয়ে বাঁচব জানি না। খুনিদের বিচার চাই। ’ একই গ্রামের মমং মারমার প্রথম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে মান্টি মারমা উক্রাচিং, মং মারমার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে উচানু মারমা ও মংক্র মারমার এসএসসি পরীক্ষার্থী সন্তান অংক্যচিং মারমা ঘটনাস্থলেই ক্ষতবিক্ষত হয় ট্রাকের চাপায়।

নেইম্রার ছোট বোন পুতুলী মারমা বলেন, ‘ওরা ভোর হলেই উঠে পড়ত। স্কুলের জন্য সাজগোজ করত। কত কোলাহল। আর সেই দিন ফিরে আসবে না। আমাদের বাবুরা আর কোনো দিনও ঘুম থেকে উঠবে না। ’

মহালছড়ি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ক্যাচিংমিং চৌধুরী বলেন, ‘এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। বারবারই দুর্ঘটনা ঘটে। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। এই ঘটনা সরকারের গাফিলতির ফল। আমরা চাই এ ধরনের ঘটনার আর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। ’

পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য জুয়েল চাকমা ঘটনার পর পরই ছুটে যান এলাকায়। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণে সর্বোচ্চ সহায়তার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নিজেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। শনিবার সকালে মহালছড়ির চোংড়াছড়িতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সমবেদনা জানান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। তাঁর পক্ষ থেকে নিহত ও আহত পরিবারগুলোকে টাকা দেওয়া হয়। এর আগে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

এদিকে শনিবার বিকেলে কয়েক হাজার মানুষ চোংড়াছড়ি মহাশ্মশানে চোখের জলে নিহতদের শেষ বিদায় জানান। এ সময় পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান চাইথোঅং মারমা, পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা জুয়েল চাকমা, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিমল কান্তি চাকমা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রতন শীল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় গতকাল মহালছড়ি পাইলট হাই স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুলে তাদের স্মরণ করা হয়। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ধর্মপুর আর্যবন বিহারে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়। পাঠ করা হয় পবিত্র ত্রিপিটক।

মাটিরাঙ্গা থানার ওসি শাহাদাত হোসেন টিটু জানান, ওই ঘটনায় প্রধান আসামি ট্রাকের চালক মো. পলাশকে ধরতে অভিযান চলছে। শুক্রবার রাতেও তার বাড়ি ও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।


মন্তব্য