kalerkantho

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ

অভিনব ‘ফাহাদজট’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে সেশনজট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বিভাগে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনো থিসিসের কাজ করছে।

কবে নাগাদ ফল প্রকাশিত হবে সেটাও জানে না ওই সেশনের শিক্ষার্থীরা। ওই বিভাগে এখন ৯টি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।

জানা গেছে, বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ আহমেদের কারণে বিভাগে এ ভয়াবহ সেশনজট চলছে। অভিযোগ রয়েছে, নকলসহ ধরা পড়ার পরও ফাহাদকে উত্তীর্ণ না করায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে বিভাগের সব শিক্ষাবর্ষের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে দ্রুত স্থবিরতা কাটাতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।

বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভাষ্য ও সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে। শেষ হয় ১০ আগস্ট। এ সময় ল্যাব পরীক্ষায় মোবাইল ফোনসহ পরিদর্শকের কাছে ধরা পড়েন ওই শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ফাহাদ আহমেদ। পরীক্ষার হল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় প্রথম বর্ষে ল্যাবে ফেল করেন ফাহাদ।

ফলে ইয়ার ড্রপ হয় তাঁর। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ (২০১৪-১৫) পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় তাঁর দুই শিক্ষাবর্ষ অবনতি হয়। তবে পরীক্ষায় ফেল বা বছর অবনতি মানতে রাজি নন ফাহাদ। তিনি দলীয় পরিচয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভাগের সব শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা আটকে দিয়েছেন বলে আভিযোগ করেছে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানায়, একজন ছাত্রের জন্য তাদের বিভাগের সব কার্যক্রম থমকে আছে। বিভাগের সব শিক্ষাবর্ষ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। তবে স্যারেরা কোনো শিক্ষাবর্ষে পরীক্ষার শিডিউল দিচ্ছেন না। অনেক আগেই কোর্স শেষ হওয়ায় বিভাগে কোনো ক্লাসও হয় না।

বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৯টি ব্যাচ রয়েছে। এর মধ্যে মাস্টার্সে আছে তিনটি ব্যাচ। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে। চলছে থিসিসের কাজ। এটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে পুরনো ব্যাচ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোনো বিভাগে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের ব্যাচ নেই। বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও মাস্টার্সে। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ অনার্স (স্নাতক) পরীক্ষা শেষ করে মাস্টার্সে ক্লাস করছে। তবে স্নাতকের ফল প্রকাশ হয়নি তাদের। বিভাগে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ অনার্স শেষ বর্ষের ক্লাস করলেও এখনো পায়নি তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ তৃতীয় বর্ষে। তাদেরও দ্বিতীয় বর্ষের ফল বাকি। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করেছে ২০১৫ সালের আগস্টে। ফলও প্রকাশ হয়েছে ওই বছর। তবে দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় এখনো বসতে পারেনি তারা। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষও প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ করেছে। ফলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ করলেও এখন পর্যন্ত শুরু করেনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। এদিকে গত ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে।

এদিকে বিভাগের এ অবস্থা সৃষ্টির কারণ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়াকে দায়ী করেছেন বিভাগের সভাপতি মো. আছাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষার রেজাল্ট না দেওয়ায় পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কমিটিতে শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতার কারণেই রেজাল্ট হচ্ছে না। ’

ফাহাদের বিষয়ে জানতে চাইলে আছাদুজ্জামান আরো বলেন, ‘ছেলেটিকে নিয়ে আমরা একাডেমিক সভা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলে পাঠাই। তত্কালীন উপাচার্য একাডেমিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হোক বলে বিভাগে একটি চিঠি দেন। তবে চিঠি পাওয়ার আগেই আমাদের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর বর্তমান উপাচার্য একাডেমিক কাউন্সিলে এ সুপারিশ বাতিল করে তাকে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিতে বলেন। আমিও তাকে এ জন্য কিছুদিন সময় দিয়েছি। সামনে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা। চাইলে সে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ’

এদিকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সার্বিক বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ‘আমি কয়েক দিন আগে চিঠি পেয়েছি। এখনো সময় করে বিষয়টি নিয়ে বসতে পারিনি। তবে দ্রুতই বসব। ’

এ ব্যাপারে ফাহাদ আহমেদ বলেন, ‘আমার কারণে হয়তো তিন-চারটি শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা হচ্ছে না। তবে আমার আগের শিক্ষাবর্ষগুলোর পরীক্ষা না হওয়ার কারণ তো আমি না। আমি আগের উপাচার্য স্যারের কাছ থেকে ফের ওই পরীক্ষাটি দেওয়ার অনুমতি নিয়েছিলাম। তবে বিভাগের স্যাররা উপাচার্য স্যারের টিঠিটি সাত মাস আটকে রেখে আমাকে আর পরীক্ষা দিতে দেয়নি। এখন পরীক্ষা দিলে আমাকে দুই বছর ড্রপ দিতে হবে। আমার বন্ধুরা চাচ্ছে আমাকে নিয়ে পরীক্ষা দিতে। ’


মন্তব্য