kalerkantho


সাভারে গণশুনানি

গয়নার রং পাল্টে যাচ্ছে, ধলেশ্বরীর মাছ মরে সাফ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাভার চামড়া শিল্প নগরীর পাশের ঝাউচরের শাহনাজ বেগম বলেন, ‘সোনার গয়নার রং পাল্টে যাচ্ছে। স্বর্ণকার বিশ্বাস করছেন না, গয়নাটি সোনার। পরে ঘষা দিয়ে বুঝতে পারছেন। ’

একই এলাকার আসমা আক্তার ঋতু বলেন, ‘আমি যখন চামড়া শিল্প নগরীর কাছ দিয়ে সিএনজিতে করে আসি তখন নাকে রুমাল ব্যবহার করেও উত্কট গন্ধ থেকে রেহাই পাই না। পাশের ধলেশ্বরী নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ মরে ভেসে উঠছে। শ্বাসকষ্ট হয়। শিশু ও বৃদ্ধদের সমস্যাটা আরো বেশি। ’

চামড়ার বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীকে কিভাবে দূষিত করছে এবং আশপাশের অধিবাসীরা কতটা ভুগছেন তা জানতে এক গণশুনানিতে এসব সমস্যার চিত্র তুল ধরেন ওই দুই নারী। সাভারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বাস্তবায়নাধীন ‘চামড়া শিল্পনগরী-ঢাকা’ প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হতে না হতেই এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।

সাভার ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যে যেন ধলেশ্বরী নদী ও সংযুক্ত বংশী নদী ও কর্ণতলী খাল দূষিত হতে না পারে এবং সাভারের পরিবেশ যেন রাজধানীর হাজারীবাগের মতো বিপন্ন না হয় এসব বিষয়ে আশু করণীয় নির্ধারণে কমিউনিটি লিগ্যাল সার্ভিসেসের (সিএলএস) সহযোগিতায় সাভার উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শুক্রবার সকালে এ গণশুনানির আয়োজন করে যৌথভাবে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি  (বেলা), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিল্স), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থা, নিজেরা করি ও সাভার পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ।

গণশুনানিতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মো. এনামুর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন সাভার উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমর। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার সভাপতিত্বে গণশুনানিতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হক। তিনি বলেন, ২৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে সাভার উপজেলা বংশী, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদ দ্বারা বেষ্টিত। এক সময় খাদ্যে উদ্বৃত্ত সাভার বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি এলাকার তালিকায়। সর্বত্র অপরিকল্পিত শিল্পায়ন আর নগরায়ণে সয়লাব হয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ আরো শক্তিশালী। অপরিকল্পিকতভাবে শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর তথাকথিত আধুনিকায়নের বদৌলতে সমগ্র সাভার এবং এর আশপাশের সব নদী-নালা, খাল-বিলের পানি যেমন দূষিত হয়েছে, তেমনই নদী-খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানিদূষণ আর নদী দখলের পালা অব্যাহত আছে।

সরকারি উদ্যোগে এলাকার মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল ডিইপিজেড ও সাভার চামড়া শিল্প নগরী তৈরি করা হয়েছে। আর সেই শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এলাকার মানুষের অবশিষ্ট হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি বিশ বছর ধরে ফসলহীন ও আগামী ২০-২৫ বছর এই জমিতে ফসল না হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইপিজেডের বর্জ্য ধলাই বিল হয়ে বংশী নদীতে মিশে নয়ারহাটের উজান থেকে সাভারের ভাটিতে কর্ণতলী খাল পর্যন্ত নদীর পানি দূষিত হয়ে গেছে। রাসায়নিক বর্জ্যের তীব্রতার কারণে বর্ষাকালেও এই পানি স্বাভাবিক হয় না। ইপিজেড ছাড়াও ব্যক্তিমালিকানায় বহু শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য স্থানীয় খাল ও নিচু জমি দিয়ে বংশী ও তুরাগ নদে ফেলা হচ্ছে। ফলে খাল ও নিচু এলাকায় শুধু ফসলের ক্ষতি হচ্ছে তাই নয়, কোনো কোনো এলাকার মানুষ তার আবাসস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে অথবা সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করে দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধন না করে ধলেশ্বরী নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে। নানা কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পদার্থ সংবলিত এই পানি তীরবর্তী এলাকার টিউবওয়েল ও কূপের পানির স্তরের সঙ্গে সংযোজিত হচ্ছে। আশপাশের পুকুরের স্তরের সঙ্গে সংযোজন হয়ে পুকুরের পানি দূষিত হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত আছে।

পানি দূষিত হওয়ার কারণে দুর্গন্ধসহ নানা রকমের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। কৃষিসহ সব কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। যার পরিণতি ভয়াবহ। এ এলাকায় নদী ও খাল-বিলে প্রাকৃতিক মাছ একবারেই নেই। মাছের আবাদও বন্ধ হয়ে গেছে।

গণশুনানি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, ‘পরিবেশের উন্নয়নে প্রয়োজনে সংসদে বিষয়টি তুলব। ২০০৩ সালে তত্কালীন সরকার দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে হাজারীবাগ থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে সাভারে এ ট্যানারি শিল্প স্থাপন করে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক নিয়োজিত কনসালট্যান্টকে দুষণের কারণ এবং ক্ষতির বিষয়ের ওপর একটি প্রতিবেদন দিতে বলেছি। ’ ডিইপিজেড কর্তৃক পরিবেশ দূষণের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি নৌকা নিয়ে দূষিত এলাকা ঘুরে দেখেছি। পরে ডিইপিজেডের জিএমকে বিষয়টি জানিয়েছি। ’

এ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমর, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইচ চেয়ারম্যান মিসেস রোকেয়া হক, সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মোল্লা প্রমুখ।


মন্তব্য