kalerkantho

দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের বরাদ্দে অনিয়ম

খালের জমিতে ভবন

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



খালের জমিতে ভবন

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে খালের জমিকে চান্দিনা ভিটা (হাট-বাজারের খাসজমি) দেখিয়ে তা বন্দোবস্ত নিয়েছেন প্রভাবশালীরা। সেখানে তাঁরা বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে নিয়মবহির্ভূতভাবে খালের জমিকে চান্দিনা ভিটা (হাট-বাজারের খাসজমি) দেখিয়ে বন্দোবস্ত দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। আর সেখানে আরেকটি অনিয়ম করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন বরাদ্দপ্রাপ্তরা।

এ ব্যাপারে স্থানীয়রা লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো পাত্তা দেয়নি প্রশাসন।

অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলে ও সরেজমিন গিয়ে ঘুরে জানা গেছে, দৌলতপুর-সমেতপুর সড়কের পাশ দিয়ে একসময় প্রবাহিত ছিল একটি খাল। নাব্য কমে যাওয়া ও দখলের কারণে দৌলতপুর বাজারসংলগ্ন একটি অংশ মূল খাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে খালের ওই অংশ সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত ও নকশায় খাল হিসেবে চিহ্নিত। রামকান্তপুর মৌজার ৪৬৮ দাগে সেখানে জমির পরিমাণ ৩৫ শতাংশ।

গত বছর উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশে ২২ জন আবেদনকারীকে চান্দিনা ভিটা হিসেবে ওই জমি থেকে প্রতিজনকে আধা শতাংশ করে একসনা (এক বছরের জন্য) বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এর পরপরই সেখানে শুরু হয় বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ।

অভিযোগকারীরা জানান, সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী, হাট-বাজারের খাসজমি ‘চান্দিনা ভিটা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ভিটা এক বছরের জন্য নির্ধারিত ফিয়ের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

চান্দিনা ভিটায় অস্থায়ী চান্দিনা বা ছাউনি দিয়ে দোকানদারি করা হয়। সেখানে কোনোভাবেই স্থায়ী বা পাকা স্থাপনা করা যায় না। কিন্তু এখানে সে নিয়ম মানা হয়নি। প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ করা হয়েছে।

সূত্র মতে, খাল, বিল, নদীনালার খাসজমি বাজার এলাকাভুক্ত (পেরি-ফেরি) করা যায় না। কিন্তু ওই জমি খাল হওয়ার পরও বাজারের পেরি-ফেরিভুক্ত করে চান্দিনা ভিটা হিসেবে লিজ দেওয়া হয়েছে অনিয়মের মাধ্যমে। এখানে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে।

সূত্র জানায়, অনিয়মের মাধ্যমে ওই জমিতে পাকা ভবন নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে দৌলতপুর-সমেতপুর রাস্তাটি আর প্রশস্ত করা সম্ভব হবে না। অথচ এ রাস্তা দিয়ে ক্রমশই বাড়ছে ট্রাক, বাসসহ যানবাহন চলাচল। রাস্তাটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই অপ্রশস্ত।

গত রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গভীর খালে পাইলিং করে আরসিসি পিলার (রড-সিমেন্ট-কংক্রিটের ঢালাই) বসানো হয়েছে। খাল থেকে প্রায় দুইতলা সমান উচ্চতায় রাস্তার সমান্তরাল ছাদও ঢালাই হয়েছে। এরপর ঢালাই হয়েছে আরো পিলার। দেখেই বোঝা যায়, বহুতল দালান হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মরত একজন মিস্ত্রি জানালেন, এই ভবন হবে পাঁচতলা।

তবে উপস্থিত আমিনুর রহমান নামে বরাদ্দপ্রাপ্ত এক ব্যবসায়ী বলেন, মাটি দিয়ে খাল ভরাট করা সম্ভব নয় বলে বরাদ্দপ্রাপ্ত সবাই মিলে পাকা পিলার দিয়েছেন। পিলারের ওপর রাস্তা সমান্তরাল মেঝেও পাকা করা হয়েছে। তবে এর ওপরে ভবন আর বাড়ানো হবে না। পাকা মেঝের ওপর টিনের দোকানঘর তোলা হবে।

আমিনুর দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমতি নিয়েই তাঁরা এ কাজ করছেন। চান্দিনা ভিটা হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়া জমিতে ইউএনও কিভাবে পাকা স্থাপনা তোলার অনুমতি দিলেন, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। ইউএনওর লিখিত অনুমতিরও কোনো কপি দেখাতে পারেননি।

তিনি বেশ জোর দিয়েই বলেন, এ নিয়ে লেখালেখি করে কোনো কাজ হবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক দৌলতপুর উপজেলার এক ভূমি কর্মকর্তা জানান, ওই জমি বরাদ্দের ব্যাপারে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে। যে কারণে একটু অনিয়ম করে জমিটি চান্দিনা ভিটায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। একই কারণে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও কর্মকর্তাদের কারো কারো ব্যক্তিস্বার্থে হচ্ছে এই অনিয়মগুলো।

যোগাযোগ করা হলে দৌলতপুরের ইউএনও কানিজ ফাতেমা জানান, বিষয়টি জানার পর কাজ বন্ধ

করে দেওয়া হয়েছে। চান্দিনা ভিটায় বিশেষ অনুমতি নিয়ে পাকা ভবন নির্মাণ করা যায়, কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। উপজেলায় নতুন যোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখা হবে।


মন্তব্য