kalerkantho


গড়াই নদ খনন প্রকল্প

মোটা অঙ্কের দুর্নীতি নেই পানির গতি

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মোটা অঙ্কের দুর্নীতি নেই পানির গতি

নাব্য রক্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কুষ্টিয়ার গড়াই নদ খনন করা হলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছে না কুষ্টিয়াবাসী। সুন্দরবনে মিঠা পানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাসহ লোনা পানির আগ্রাসন ঠেকাতে নেওয়া গড়াই খনন প্রকল্প সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে বসেছে।

খননকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়ম, অপরিকল্পিত খনন ও দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে এমনটি হয়েছে বলে নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নদতীরবর্তী বাসিন্দারা জানিয়েছে, সাত বছর ধরে গড়াই খনন চললেও এর কোনো সুফল মিলছে না। বিগত সাত বছরের অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার আবার পাঁচ বছরের জন্য নতুন করে খননের পরিকল্পনা করছে। এ কারণে ভবিষ্যতে এ প্রকল্পে সুফল না মেলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পদ্মার শাখা নদ গড়াই। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠা পানি সরবরাহের একমাত্র উৎস। তাই নদ পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় পর্যায়ে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এ অনুযায়ী ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৯৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। পরে দরপত্রের মাধ্যমে চিনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড’ খননের দায়িত্ব পায়।

দুই বছরের চুক্তিতে কম্পানিটি ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডাব্লিউএম) নকশা অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে নদের উৎসমুখ তালবাড়িয়া থেকে খোকসার জানিপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে খননকাজ সম্পন্ন করে। পরের দুই বছর ২০১৩-১৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিজস্ব প্রকৌশলী এই খননকাজ তদারকি করেন। এরপর আবারও ২০১৫-১৭ সালে তিন বছরের একটি খনন পরিকল্পনা নেয় পাউবো। যেটি এ বছর শেষ হচ্ছে। পাউবোর খনন বিভাগ নিজস্ব ড্রেজার দিয়ে এ কাজ পরিচালনা করছে।

গত সোমবার গড়াইয়ের উৎসমুখ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া থেকে খোকসা উপজেলার জানিপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার নদ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুকনো মৌসুম শুরু না হতেই গড়াই এখন ধু ধু বালুচর। তালবাড়িয়া থেকে জানিপুর পর্যন্ত চর পড়ে পানিপ্রবাহ তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে। মাঝেমধ্যে কিছু গর্তে আটকে আছে সামান্য পানি। সেখানে গোসলসহ অন্য কাজ সারছে মানুষজন। নদের কুষ্টিয়া শহরসংলগ্ন জিকে ও ঘোড়াঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, হাজার হাজার মানুষ হেঁটে পার হচ্ছে। পানি না থাকায় কয়েক কিলোমিটার হেঁটে তাদের আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। এতে বয়স্ক ও রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গড়াইয়ের উৎসমুখের বাসিন্দা ও তালবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান মিঠু বলেন, ‘নদ খননের সুফল কই? নদ আগেও যা ছিল এখনো তাই আছে। খননের নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত হওয়া উচিত। ’

কুষ্টিয়া শহরের বড়বাজারের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘নদ খননে আমরা কোনো লাভ দেখতে পাচ্ছি না। খনন করা বালু তীরে ফেলা হয়েছে। সেই বালু ফের নদীতেই চলে আসছে। ’ একই এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নদ খুঁড়ে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ না হলেও কিছু নেতা এবং খননকাজে জড়িত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর পকেট ভরেছে। ’ নদতীরবর্তী খোকসার বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ড্রেজার দিয়ে নদ থেকে বালু তুলতে দেখি। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। তাহলে খননের নামে শত শত কোটি টাকা কোথায় গেল?’

কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, ‘সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা গড়াইকে সচল রাখতে এ প্রকল্প দিয়েছেন। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নদ খনন হচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছে না। দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আরো টাকা ঢেলেও নদে পানি পাওয়া যাবে না। ’

কুষ্টিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা, পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকার নর্দান ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য (প্রোভিসি) ড. অনোয়ারুল করিম বলেন, ‘গড়াই খননের প্রধান লক্ষ্য ছিল সুন্দরবনকে বাঁচানো এবং এ অঞ্চলের লবণাক্ততা হ্রাস করা। উত্তোলনকৃত বালু কূলে ফেলার কারণে খননের উদ্দেশ্য পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। সরকারের হাজার কোটি টাকা জলে চলে যাচ্ছে। এখন খনন করেও নদীতে কোনো প্রবাহ নেই। এ খনন থেকে স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদি কোনো সুফল আসেনি। নদে পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হলে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। ’ কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। নতুন করে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন চলতি বছরের খননকাজ চলছে। শেষ হলে পানিপ্রবাহ বাড়বে। এ ছাড়া প্রকল্পের যে উদ্দেশ্য সেটাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ’


মন্তব্য