kalerkantho


আজ এসএসসি পরীক্ষায় বসছে পাপিয়া

স্বপ্নজয়ের অভিযান

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্বপ্নজয়ের অভিযান

ববিতা আখতার পাপিয়া। আজ শুরু হচ্ছে তার এসএসসি স্বপ্নজয়ের অভিযান। জন্মের পর থেকেই তার দুই হাতে শক্তি নেই। পা দিয়ে লিখেই তার বেড়ে ওঠা। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

জন্মের পর থেকেই দুই হাতে কোনো শক্তি পায় না ববিতা আখতার পাপিয়া। তবু সে থেমে থাকেনি।

পা দিয়ে লিখেই সে একের পর এক শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০১৪ সালে সে ভালো ফল নিয়ে পাস করেছিল জেএসসি পরীক্ষা। আজ বৃহস্পতিবার পা দিয়ে লিখে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে পাপিয়া।

মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া নওদাপাড়ার পিয়ারুল ইসলামের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছোট পাপিয়া। সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সে ও তার বড় বোন পপি খাতুন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তাদের সিট পড়েছে মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে।

দুই হাতে শক্তি না থাকায় পাপিয়াকে লেখাসহ বই-খাতার পাতা খোলা, ঠিকমতো গুছিয়ে রাখা—সব কাজকর্ম সারতে হয় দুই পা দিয়ে। তার কাজে সহযোগিতা করে বোন পপি খাতুনসহ পরিবারের সদস্যরা। গত মঙ্গলবার পাপিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পা দিয়ে একটি বইয়ের পাতা উল্টিয়ে পড়া খুঁজে বের করছে পাপিয়া।

কিছুক্ষণ পড়ার পর সেগুলো একটি খাতা বের করে পা দিয়ে ঠিকমতো কলমটি ধরে লেখা শুরু করল সে। দেখে মনে হলো না সে পা দিয়ে লিখছে। অন্যরা হাতে যেভাবে লেখে, পা দিয়ে একই রকম করে অনায়াসে লিখে যাচ্ছে পাপিয়া।

কথা হলো পাপিয়ার মা আরিফা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিয়েছে পাপিয়া। জন্মের পর এলাকার বিভিন্ন ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম। তাঁরা বলেছেন, চিকিৎসা করে কোনো লাভ হবে না। আমরা গরিব মানুষ, তাই মেয়েকে বাইরের কোনো ডাক্তারকে দেখাতে পারিনি। জানি না দেখালে ভালো হতো কি না। ’

আরিফা বলেন, ‘পাপিয়াকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করছি। সে যেন কারো কাছে হাত না পাতে সে জন্য তাকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি। লেখাপড়ায় তার খুব আগ্রহ। সে যত দূর লেখাপড়া করতে চায় কষ্ট করে হলেও আমরা তাকে পড়াব। ’

পপি খাতুন বলে, ‘আমি তার (পাপিয়া) সমস্ত কাজ করে দিই। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। এখন আর কষ্ট হয় না। গর্ব হয়। কারণ আমার বোন আজ পা দিয়ে লিখেই এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ’

পাপিয়ার সহপাঠী নাজমুন্নাহার বলে, ‘পাপিয়া পা দিয়ে লেখার কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। সে জেএসসিতেও ভালো রেজাল্ট করেছে। আমার বিশ্বাস, সে এসএসসিতেও ভালো রেজাল্ট করবে। ’

পাপিয়ার প্রতিবেশী হোসনে আরা বলেন, ‘লেখাপড়ার প্রতি পাপিয়ার খুব আগ্রহ। তার বাবা-মা গরিব। তার পরও সে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে পা দিয়ে লিখে লেখাপড়া করে যাচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষায় সে ভালোভাবে পাস করুক, এই দোয়া করি। ’

পাপিয়া জানায়, শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও সে সমাজের বোঝা হতে চায় না। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায়। তার স্বপ্ন, সে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে। সমাজের অসহায়-দুস্থদের ছেলে-মেয়েদের সে লেখাপড়া শেখাবে।

পাপিয়া বলে, ‘আমার এ পর্যন্ত আসতে অনেকের সহযোগিতা রয়েছে। বাবা-মা, ভাই-বোন, সহপাঠী, শিক্ষক, পাড়া-প্রতিবেশী আমাকে সহযোগিতা করেছে। তাদের সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ’

ঝাউবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাপিয়া সমাজের একটি উদাহরণ। হাতে শক্তি না পেলেও পা দিয়ে লেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সে। তার অদম্য আগ্রহই তাকে সমাজের একটি উচ্চ আসনে নিয়ে যাবে, এ বিশ্বাস আমার রয়েছে। ’ সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুর রকিব বলেন, ‘পাপিয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। লেখাপড়ার প্রতি তার অদম্য আগ্রহ রয়েছে। এসএসসিতেও সে ভালো ফল করে বিদ্যালয়ের সম্মান বয়ে আনবে, সেই প্রত্যাশা আমি করি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে পরীক্ষায় তার জন্য অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করা হয়েছে। ’

পাপিয়ার দুই হাতের সমস্যা নিয়ে কথা হলো মেহেরপুরের সিভিল সার্জন রাশেদা সুলতানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটা জেনেটিক ডিস-অর্ডারের কারণে হয়ে থাকে। এ ধরনের রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। ’

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র গোলদার বলেন, পাপিয়ার জন্য প্রতিটি পরীক্ষায় অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ বলেন, ‘পাপিয়ার লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ’


মন্তব্য