kalerkantho


কিশোরগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই

মাঠের যোদ্ধারা বাদ তালিকা বিতর্কিত

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মাঠের যোদ্ধারা বাদ তালিকা বিতর্কিত

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যাচাই-বাছাই শেষে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিতরা স্থান পেয়েছে।

আর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের।

সাবেক স্কুল শিক্ষক মো. শাখাওয়াত হোসেন (৬২) সদর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ছিলেন অন্তত ১৫ বছর। তাঁকেও যাচাই-বাছাইয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি মীর শওকত আলীর নেতৃত্বাধীন ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর মুসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে সিলেটের তাহেরপুরসহ বিভিন্ন সম্মুখ লড়াইয়ে অংশ নেন। তাহেরপুরের যুদ্ধে তাঁদের কম্পানি কমান্ডার ছিলেন আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘আমিসহ ১২৫ জন বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে একসঙ্গে নিকলীর করগাঁও হয়ে টেকেরঘাট যাই। আমার মতো রণাঙ্গনের এক যোদ্ধাকে কিভাবে তারা বাদ দেয়?’ তাঁর অভিযোগ, ‘যাচাই-বাছাই কমিটি আমাকে তেমন কোনো প্রশ্ন করেনি। আমার সাক্ষীদেরও ডাকা হয়নি। ’ তিনি মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের গত নির্বাচনে (২০১৪) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণে তাঁকে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

শহরের বত্রিশ এলাকার বাসিন্দা ডা. সুকেশ চন্দ্র রায় (৭৭) অভিযোগ করেন, যাচাই-বাছাই কমিটি তাঁর কোনো কাগজপত্র দেখেনি। তিনি যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, তা না দেখে তালিকা প্রকাশের শিটে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমাকে কোনো প্রশ্নই করা হয়নি। তাহলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে যাচাই করা হলো?’ তাঁর ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতের বড়ছড়া ক্যাম্পে চলে যান। বিভিন্ন ক্যাম্পে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন বলাট ক্যাম্পের এম এন এ আবদুল কদ্দুস মোক্তার তাঁকে রণাঙ্গনে না গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে গাগলাইল গ্রামে আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সব লুটপাট করে নিয়ে যায় স্থানীয় রাজাকাররা। বিশাল ভূসম্পত্তিও বেদখল হয়ে যায়। আজও আমি সেসব ফেরত পাইনি। তবু একটা শান্তি ছিল, আমি মুক্তিযোদ্ধা। এখন সেই শান্তিটুকুও কেড়ে নিতে চাইছে আমার সহযোদ্ধারা। এ কষ্ট সহ্য করা খুবই কঠিন। ’

বত্রিশ এলাকার আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ রুকন উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিবার্তা, সাব-সেক্টর কমান্ডসহ যেসব সনদপত্র দরকার সবই উত্থাপন করা হয়েছে। আমার সাক্ষীরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে কোনো সাক্ষ্য নেয়নি কমিটি। অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিয়েছে। ’

সদর উপজেলার হাজিপুরের ফজলুর রহমান, হাজিরগল গ্রামের আবুল হাশেম, এম এ গনি অভিযোগ করেন, ‘যাচাই-বাছাই কমিটি আমাদের কোনো সাক্ষীকে জেরা করেনি। অথচ এ কাজটি ছিল বাধ্যতামূলক। ’

গাগলাইল গ্রামের সুন্দর আলী বলেন, ‘তালিকা থেকে বাদ না দিয়ে তারা যদি গুলি কইরা মাইরালতো, তা অইলেও অত কষ্ট অইলা না আমার। ’

একই গ্রামের নূরুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘আমারে জ্যান্ত কবর দিয়ালছে বাছাই কমিটি। ’

কমিটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, শহরের আখড়াবাজারের বাসিন্দা কাজী সেলিম খানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়ে ২০১০ সালে অভিযোগ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু এবার যাচাই-বাছাই কমিটি তাঁকে তালিকাভুক্ত করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় নতুন আবেদন ও গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মিলিয়ে মোট ২৯৩ জন যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আসে। এর মধ্যে ৪৮ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কমিটি। তালিকা গত শনিবার উপজেলা পরিষদের নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির মধ্যে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আবু বক্কর ছিদ্দিক ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) প্রতিনিধি মফিজ উদ্দিন প্রমুখ।

যাচাই-বাছাই কমিটির কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি সদস্য ভূপাল চন্দ্র নন্দী বলেন, ‘জেনুইন মুক্তিযোদ্ধারা যদি কোনো কারণে বাদ পড়ে থাকেন, তাহলে তো আপিল করার সুযোগ দেওয়াই আছে। ’ অমুক্তিযোদ্ধা সেলিম খানের বিষয়ে বলেন, ‘অবশ্যই তার কোনো ডকুমেন্ট-টকুমেন্ট হয়তো দাঁড় করাইছে, যার কারণে অইছে। না অইলে তো অইত না। ’ ঠিকমতো সাক্ষ্য না নেওয়া বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কমিটিতে সাতজন লোক। এনো সাতজনের সাত মত। আমি একা রাইট দিলে কী অইব? বাকি ছয়জন যদি রাইট না দেয়, তাহলে তো কোনো কাজ হবে না। ’

কমিটির সদস্য কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার অ্যাডভোকেট মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘৪৩ বছর পরে একটা যাচাই-বাছাই হচ্ছে, এখানে সমস্যা তো থাকবেই। এতে ভালো কেউ বাদ পড়ে যেতে পারে। খারাপও তালিকাভুক্ত হয়ে যেতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক কিছু না। ’

যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যসচিব ও কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, ‘প্রতিটি আবেদন আমরা সামগ্রিকতার আলোকে বিবেচনা করেছি। তবে কমিটিতে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁরা সবাই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াতে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের চেনেন। তাই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ওনাদের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে বেশি। এখানে ভুলত্রুটি হতে পারে। সংক্ষুব্ধরা ইচ্ছে করলে আপিল করতে পারবেন। ’

যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. আসাদ উল্লাহর মোবাইল ফোনে সোমবার দুপুরে কয়েকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।


মন্তব্য