kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কালিহাতীতে টিআর প্রকল্প

কাজ না করেই টাকা হরিলুট

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কাজ না করেই টাকা হরিলুট

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলা স্কাউট ভবনের মাঠ ভরাট, সম্প্রসারণ ও সংস্কার করার কথা। অথচ এ ভবনের সামনে কোনো মাঠ নেই। আছে রাস্তা। টাকা লুটপাটের জন্যই এমন প্রকল্প বানানো হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর—নগদ অর্থ) কর্মসূচির আওতায় টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক প্রকল্প ভুয়া দেখানো হয়েছে, আবার কোনো কোনো প্রকল্পে বরাদ্দ দেখিয়ে কাজই করা হয়নি।

অধিকাংশ প্রকল্পে বেশি বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে এসব অভিযোগের অধিকাংশেরই সত্যতা মিলেছে।

কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্বর। সেখানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগারের ঘর উন্নয়ন বাবদ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের আওতায় দুই লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই নামে কোনো পাঠাগার কালিহাতীতে নেই।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, চত্বরসহ বাসস্ট্যান্ডে বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো পাঠাগার কখনো ছিল না, এখনো নেই। ‘কালিহাতী সাধারণ পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার রয়েছে কালিহাতী উপজেলা পরিষদ এলাকায়। শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্বরের পাশের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়েও জালিয়াতি? কী হবে এসব লিখে? যারা টাকা খেয়েছে তাদের বিচার কে করবে? পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর হয়তো ধামাচাপা দেওয়ার জন্য দেখা যাবে কোনো রকমে একটি ঘর তোলা হবে, সাইনবোর্ড টাঙানো হবে। তারপর সব শেষ।

কালিহাতী কাঁচাবাজারসংলগ্ন গণশৌচাগার ও সাতুটিয়া কবরস্থানে মাটি দ্বারা গর্ত ভরাট বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয় তিন লাখ টাকা। অথচ কালিহাতী কাঁচাবাজারসংলগ্ন কোনো গণশৌচাগার নির্মিত হয়নি। বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, কালিহাতী পৌরসভা হওয়ার পর প্রথম কাঁচাবাজারে গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়। সেটি ভেঙে গেলে ব্যবসায়ীরা মিলে চাটাই দিয়ে সাময়িক ব্যবস্থা করেন। সেটিও ভেঙে গেছে। বর্তমানে সেখানে কোনো গণশৌচাগার নেই।

বাজারের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ১৯ বছর ধরে এ বাজারে ব্যবসা করছি। এখানকার যা উন্নয়ন বেশির ভাগ ব্যবসায়ীরা মিলে করেছে। গণশৌচাগার না থাকায় দোকান রেখে কালিহাতী বাসস্ট্যান্ডে যেতে হয়। সেখানে টাকার বিনিময়ে জরুরি প্রয়োজন সারতে হয়। ’

বাজার কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, অনেক দিন ধরে কালিহাতী কাঁচাবাজারে কোনো গণশৌচাগার নেই। এতে ব্যবসায়ীদের খুব কষ্ট হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। এটি খুব দরকার।

কালিহাতী পৌরসভার স্কাউট ভবনের মাঠ ভরাট, সম্প্রসারণ ও সংস্কার বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তিন লাখ ২১ হাজার ২৮৯ টাকা। অথচ কালিহাতী স্কাউট ভবনের কোনো মাঠ নেই। ভবনের সামনে রাস্তা, পাশে একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা। কালিহাতী উপজেলা স্কাউটের সম্পাদক শুকুর মাহমুদ তালুকদার বলেন, ‘কালিহাতীতে স্কাউট ভবন আছে। তবে নিজস্ব কোনো মাঠ নেই। স্কাউটের কোনো অনুষ্ঠান হলে পাশের কালিহাতী আরএস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় অথবা খিলদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ ব্যবহার করতে হয়। মাঠ ভরাট, সম্প্রসারণ ও সংস্কার বাবদ অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই। ’

টিআর প্রকল্পের আওতায় সরকারি কোনো দপ্তরের কর্মকর্তা-কারচারীর মধ্যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার বিধান নেই। অথচ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে কর্মরত দুজন অফিস সহায়ক এ বরাদ্দ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জয়নাল আবেদীনের নামে ৮০ হাজার ও আরশেদ আলীর নামে ৭৩ হাজার ৫৩৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জয়নাল আবেদীন বাবু বলেন, ‘আমাদের দুজনকে একটি করে সোলার দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা দিয়ে অফিসের সিলিং লাগানোসহ বেশ কিছু কাজ করা হয়েছে। ’

এ বিষয়ে পিআইও আল আমিন বলেন, তাঁরা দুজন মাস্টাররোলে চাকরি করেন। দুজনই খুব দরিদ্র। তাঁদের একটি করে সোলার দিয়ে বাকি টাকায় অফিসে আইপিএস লাগানো হয়েছে। টিআর কাজের অন্য বরাদ্দে অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে বলেন, মেঘাখালী নদীর পাড়ে যে কাজ করার কথা ছিল পানি বৃদ্ধির কারণে তা করা যায়নি। এখন কাজ শুরু হয়েছে। স্কাউট ভবনের মাঠ না থাকলেও ভবনের সামনের গর্ত ভরাট করে বাকি টাকা দিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ করা হয়েছে। মোটকথা কোনো কাজ অসম্পন্ন থাকবে না।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে টিআর প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যেসব প্রকল্পে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে। কালিহাতী শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্বরের পাশে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগারের নামে সাইনবোর্ড টাঙানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

এসব বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু নাসার উদ্দিন বলেন, পিআইও ঘুরে ঘুরে দেখছেন কোথায় কোথায় কাজ হয়নি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 


মন্তব্য