kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অসুস্থ মাকে রাস্তায় ফেলে পালাল ছেলে!

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অসুস্থ মাকে রাস্তায় ফেলে পালাল ছেলে!

চার দিন ধরে সড়কের পাশে পড়ে থাকা টগর রানী সাহাকে সেবা করছে এলাকাবাসী। ছবিটি গতকাল কেন্দুয়া-নান্দাইল সড়কের বাঁশহাটি এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাঁ পায়ে ঘা, পোকা করছে কিলবিল। শরীরে মশা-মাছি বসছে।

ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এ অবস্থায় আহাজারি করছেন রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। উত্সুক লোকজন নাক চেপে উঁকি মেরে তাঁকে এক পলক দেখে চলে যাচ্ছে। তবে চলে যাননি দুই বোন সমলা (৫৫) ও খাতুনা (৫০)।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সমলা ও খাতুনা জানান, তিন দিন ধরে তাঁরা দুজন বৃদ্ধার সেবা-শুশ্রূষা করছেন। কোথায় তাঁর বাড়ি, কী তাঁর পরিচয়, জানেন না দুই বোন। তবে বৃদ্ধা তাঁদের বলেছেন, গত সোমবার তাঁর সন্তান এখানে তাঁকে ফেলে রেখে চলে যায়। আবার তিনি এও বলেছেন, সন্তানের কথা যেন কাউকে বলা না হয়। বললে পুলিশে তাকে ধরে নিয়ে যাবে। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে।

খবর পেয়ে গতকাল সকালে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার বাঁশহাটি এলাকায় নান্দাইল-কেন্দুয়া সড়কের পাশে যান এ প্রতিবেদক। খবর দিলে গুরুতর অসুস্থ ওই নারীকে উদ্ধার করে নান্দাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে তাঁর বাঁ পায়ে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে দেখতে হাসপাতালে শত শত লোক ভিড় করছে। আর ধিক জানাচ্ছে ওই সন্তানকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পশ্চিম পাশে চারটি বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি প্লাস্টিকের চট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে একটি স্থান। সেখানে পড়ে আছেন ওই বৃদ্ধ নারী। আহ্, ওহ্ করে ছটফট করছেন। তাঁর পাশে পড়ে আছে কলা, কিছু ফলের রস ও আগন্তুকদের দেওয়া টাকা-পয়সা। মধ্য বাঁশহাটি গ্রামের রফিকুল ইসলাম (৩৮) জানান, গত সোমবার সকালে তিনি স্থানটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওই নারীকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এ অবস্থায় কেউ এগিয়ে না আসায় রফিকুলের পাশের বাড়ির দুই বোন সমলা ও খাতুনা সেবা-যত্ন করে বৃদ্ধার চেতনা ফেরান। গ্রামের লোকজন চাটাইয়ের ওপর চটের বস্তা পেতে শয্যার ব্যবস্থা করে এবং রোদ প্রতিরোধে বাঁশের খুঁটি পুঁতে চাদোয়া টানিয়ে দেয়। সড়কের পাশে এ অবস্থায় বৃদ্ধ নারীর তিন দিন কাটে। এ সময় তিনি বারবার তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আকুতি জানালেও গ্রামের লোকজন ঝামেলার ভয়ে নেয়নি।

সমলা খাতুন জানান, এই কয়েক দিন তাঁরা দুই বোন পালাক্রমে বৃদ্ধার দেখাশোনা করেছেন। রাতে শেয়াল এসে বেশ কয়েকবার হানা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এ অবস্থায় লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের স্বজনদের কাছে রেখে পাহারা দিয়েছেন।

এ প্রতিবেদককে ওই বৃদ্ধা অস্পষ্ট কণ্ঠে জানান, তাঁর নাম টগর রানী সাহা। স্বামী হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এলাকার মৃত নিতাই চন্দ্র সাহা। ছেলে দেবাশীষ সাহা তাঁকে এখানে রেখে গেছে।

টগর রানীর শারীরিক অবস্থা ততটা ভালো নয়। তাঁর বাঁ পায়ের পাতায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, পোকা কিলবিল করছে। টগর রানীকে সেবাদানকারী সমলা বলেন, তিনি স্যাভলন ও ন্যাপথলিন দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

গতকাল সকালে নান্দাইল থানার ওসি মো. আতাউর রহমানকে বিষয়টি জানালে তিনি তাৎক্ষণিক থানার পিকআপ ভ্যান পাঠিয়ে দেন ঘটনাস্থলে। সেখান থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল খালেক পুলিশ সদস্যদের নিয়ে টগর রানীকে উদ্ধার করে নান্দাইল হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাজুল ইসলাম খান দ্রুত টগর রানীকে জরুরি বিভাগে নিয়ে পায়ে অস্ত্রোপচারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

ডা. তাজুল ইসলাম জানান, টগর রানীকে এখানে তাঁর তত্ত্বাবধানে কয়েক দিন রাখা হবে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ শহরে পাঠানো হবে।

 


মন্তব্য