kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তালিকায় জনপ্রতিনিধিদের স্বজন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



তালিকায় জনপ্রতিনিধিদের স্বজন

‘আমার এক কাটাও সম্পত্তি নাই। ম্যানষের জমিত ঘর কইরে আচি।

কাম হলে গা খাওয়া জুটে। কাম না থাকলে না খ্যায়াই দিন পার করতে হয়। কিন্তু আমার কার্ড নাই। যারে ১০-২০ বিগে জমি আচে, তাদেরও কার্ড হছে বলে শুনেছি। ’ এভাবে কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া গ্রামের দিনমজুর শুকুর আলী।

অভিযোগ রয়েছে, এ ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজি চালের তালিকায় কার্ড হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যদের সম্পদশালী আত্মীয়স্বজনদের নামে। এ নিয়ে বঞ্চিত হতদরিদ্ররা গত ১৬ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে। ওই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চৌবাড়িয়া গ্রামের জালাল হোসেনসহ ৩০ জন হতদরিদ্র ব্যক্তি এ অভিযোগ করে। এর আগে গত ১১ অক্টোবর পানানগর ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাহার আলীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে স্থানীয় হতদরিদ্ররা।

দুর্গাপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে জানা যায়, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নে ৯১৯ জন, কিশমত গনকৈড় ইউনিয়নে ৯১৯ জন, পানানগরে ৯১৯ জন, দেলুয়াবাড়ীতে ৯১৯ জন, ঝালুকায় ৯১৯ জন, মাড়িয়া ইউনিয়নে ৭৭০ জন ও জয়নগর ইউনিয়নে ৯১৯ জনের তালিকা তৈরি করা হয়। উপজেলায় মোট ছয় হাজার ২৮৪ জন হতদরিদ্রের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির এ তালিকা প্রস্তুত করে এরই মধ্যে চাল বিক্রি হয়েছে বেশির ভাগের কাছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মাড়িয়া ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। তালিকায় লোক দেখানো দুই চারটি দরিদ্রের নাম দিলেও বেশির ভাগ নাম দিয়েছেন সম্পদশালীদের। ৩-১০ বিঘা জমির মালিকদেরও তালিকায় নাম রয়েছে। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন আজিজুল মণ্ডল (কার্ড নম্বর ১), মহসিন খান (১৬) ও সানোয়ার হোসেন (১৭)।

তবে ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, ‘কার্ডধারীরা সবাই হতদরিদ্র। তাদের নিজ নামে কোনো সম্পত্তি নাই। থাকলে বাপের নামে সম্পত্তি রয়েছে। ’

অন্যদিকে পানানগর ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আজাহার আলী খাঁ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হতদরিদ্রদের তালিকায় সম্পদশালী আত্মীয়স্বজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পানানগর ইউপির হতদরিদ্রদের তালিকায় রয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান আজাহার আলী খাঁর ভাই মোজাম্মেল খাঁ (কার্ড নম্বর ৪২৮)। তিনি পাকাবাড়িসহ ১০ বিঘা জমির মালিক। ৪৬২ নম্বর কার্ডধারী আবুল হোসেন শেখ তাঁর নিকটাত্মীয়। ফ্ল্যাটবাড়িসহ ২০ বিঘা সম্পত্তির মালিক ৩৯২ নম্বর কার্ডধারী শামসুল ইসলাম চেয়ারম্যানের নিকটাত্মীয়। এ ছাড়া চেয়ারম্যানের মামাতো ভাই বাবুল হোসেন, খালাতো ভাই নজরুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন বিত্তবানের নাম রয়েছে তালিকায়। যাঁরা সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগকর্মী বলে পরিচিত।

পানানগর ইউপি চেয়ারম্যান আজাহার আলী খাঁ ভাইয়ের নামে কার্ড ইস্যু করার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনদের নামে কার্ড ইস্যু করা যাবে না, এমন কোনো আইন আমার জানা নাই। তারা যদি গরিব হয়, তাহলে তারাও এই চাল প্রাপ্য। ’ তবে ফ্ল্যাটবাড়ি ও সম্পত্তি থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।

এ বিষয়ে দুর্গাপুরের ইউএনও আক্তারুন্নাহার বলেন, ‘আমার কাছে কিছু হতদরিদ্র ব্যক্তি পানানগর ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ করেছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য