kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বয়স ‘বাড়িয়ে’ ৩ কিশোরকে সাজা!

রফিকুল ইসলাম, বরগুনা থেকে ফিরে   

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বয়স ‘বাড়িয়ে’ ৩ কিশোরকে সাজা!

বঙ্গোপসাগর তীরের গ্রাম চরলাঠিমারা। সেই গ্রামের আবদুল খালেক ফকিরের ছেলে হাসান।

সে পড়ালেখা করে পাথরঘাটা পৌর এলাকার গোরস্থান মাদ্রাসায়। হাসানের বাবা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে। গত ১৩ অক্টোবর হাসান মাছ ধরা ট্রলারে করে মাদ্রাসায় যাচ্ছিল। সঙ্গে ছিল তার সহপাঠী আবুল বাশার। এ সময় বিষখালী নদী থেকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তাদের আটক করে। ওই দিন পৃথক ঘটনায় রুবেল নামে আরেক কিশোরকেও আটক করা হয়। হাসান, বাশার ও রুবেল তিনজনের বয়স ১৫ বছরের মধ্যে। কিন্তু বয়স বাড়িয়ে দিয়ে তাদের এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাদের বিরুদ্ধে ইলিশ শিকারের অভিযোগ আনা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম এ সাজা প্রদান করেন।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া রায়ের কপি ঘেঁটে দেখা গেছে, কিশোর হাসানের বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

বাশারের বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ১৮ বছর ছয় মাস। একই দিন পৃথক অভিযানে আটক হওয়া রুবেল হোসেনের বয়স দেখানো হয়েছে ১৮ বছর সাত মাস। তাদের তিনজনকেই এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাসানের জন্মসনদ আর পঞ্চম শ্রেণি পাসের সনদ অনুযায়ী তার প্রকৃত বয়স ১৫ বছর ৭ মাস।

কিশোর হাসানের বাবা খালেক ফকিরের ভাষ্যানুযায়ী, জেলে আ. সোবাহান হাওলাদার তাঁর প্রতিবেশী। সোবাহানের ছেলে আবুল বাশার তাঁর ছেলের সঙ্গে একই বিদ্যালয়ে পড়েছে। হাসান আর বাশার সমবয়সী।

বরিশাল জেলা মত্স্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, অবরোধের সময় ইলিশ শিকার, পরিবহন নিষিদ্ধ। এমন অভিযোগে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি অপরাধ বিবেচনায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজার বিধান রয়েছে। সাধারণত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা প্রদান করে থাকেন। কিন্তু শিশু অর্থাৎ ১৮ বছরের কম বয়সী জেলেদের সাজা দেওয়ার বিধান নেই। তাদের শুধু অপরাধের দায়ে অর্থদণ্ড করা যাবে।

উপকূলরক্ষী বাহিনী পাথরঘাটার স্টেশন কমান্ডার সাব-লেফটেন্যান্ট মো. হাসানুর রহমান। তিনি ১৩ অক্টোবর স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, অবৈধভাবে সাগর মোহনায় ইলিশ ধরার সময় দুটি মাছ ধরা ট্রলার (ইঞ্জিনবোট) জব্দ করেন। সেখান থেকে ২০ জেলেকে আটক করেন। একই সঙ্গে ওই ট্রলার তল্লাশি করে প্রায় তিন লাখ মিটার মাছ ধরার জাল উদ্ধার করেন। পরবর্তী সময়ে আটককৃতদের পাথরঘাটা লঞ্চঘাট লাগোয়া তাঁদের স্টেশনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সেদিন রবিউল ইসলাম জানান, মত্স্য আইন অমান্য করায় আটক ১৬ জেলেকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য তিনজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মো. স্বপনের ছেলে মো. সরোয়ার (১৩) অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আবুল বাশারের বাবা সোবাহান হাওলাদার ও হাসানের বাবা খালেক ফকির ১৭ অক্টোবর বরগুনায় আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শের জন্য গিয়েছিলেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে বরগুনায় তাঁদের কথা হয়। জেলখানায় তাঁরা সন্তানদের সঙ্গে দেখাও করেছেন।

তাঁরা বলেন, ‘পোলা দুইড্যা খালি কান্দে আর কয়—বাবা মোগো নিয়া যাও। এহ্যানে মোরা কষ্টে আছি। বড়রা মোগো দিয়া খালি এডা-ওডা করায়। হ্যাগো কথা না হুনলে খালি মারে। মোরা নালিশও হরতে পারি না। ’ আ. খালেক ফকির বলেন, ‘জেলে ছেলেডা কান্দে আর ওর মায় কান্দে ঘরে। মুই এ্যাহোন যে কী হরমু তা ভাইব্যাই পাই না। ’

দুজনই যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁদের চোখ ছিল জলে ভরা। হাসানের স্কুলের সনদ আর চেয়ারম্যানের দেওয়া জন্মসনদ দেখিয়ে বলেন, ‘শিশুদের সাজা দেওয়া হলো, ওরা এখন দাগি আসামিদের সঙ্গে থাকছে। জেল থেকে বেরিয়ে কী করবে কে জানে?’

ট্রলারের ব্যাপারে বলেন, ‘২৫ হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিনচালিত ট্রলার দিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরা হয়। ট্রলারে কম করে হলেও সাতজন জেলে দরকার। সেখানে দুই শিশুসহ ট্রলার মালিক কিভাবে বিষখালীতে জাল ছাড়াই মাছ ধরেছে।

পাথরঘাটা উপজেলার হারিটানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, ‘প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হাসান তাঁর স্কুলে পড়ালেখা করেছে। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় হাসান উত্তীর্ণ হয়েছে। সে অনুযায়ী তার জন্ম ২০০১ সালের ১ মার্চ। ’

প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, ‘হাসানের বাবা সৌদি আরব ছিলেন। সেখান থেকে এসেই হাসানকে পাথরঘাটার একটি মাদ্রাসায় হেফজখানায় ভর্তি করেছেন। হাসান এলাকায় থাকে না সে পাথরঘাটা পৌর এলাকায় বাস করে। শুনেছি শিশু হাসানকে ইলিশ শিকারের অপরাধে সাজা দেওয়া হয়েছে। ’

 উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। সেখানে বয়স খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সময় থাকে না। তবে অনুমান নির্ভরভাবে তিনজনের বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। ১৮ বছরের কাছাকাছি বয়স থাকায় তাদের সাজাও এক মাসের দেওয়া হয়েছে। ’

শিশুদের সাজা দেওয়ার বিধান নেই এ কথা স্বীকার করে মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ওরা চাইলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইনের মধ্যে থেকে আমি তাদের সহযোগিতা করব। সাজাপ্রাপ্ত অন্য ১৬ জনের বয়স রায়ের কপিতে উল্লেখ না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি ক্লারিক্যাল মিসটেক। ’

বরগুনা জেলা প্রশাসক ড. মুহা. বশিরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত যে রায় দিয়েছেন তা তাত্ক্ষণিক। সেই রায়ে ত্রুটি থাকলে বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করা যাবে। বয়স বাড়িয়ে শিশুদের কারাদণ্ড দিয়ে থাকলে সেই সাজা আপিল অথরিটি খারিজ করে দেবেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি জুডিশিয়াল, তাই এ ব্যাপারে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। ’


মন্তব্য