kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লবণ মাঠে ‘আলোর চাষ’

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



লবণ মাঠে ‘আলোর চাষ’

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীর চিংড়িঘেরের এক হাজার ৪১৪ একর জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে জাইকার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে। ২১ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস তছনছ করেছিল কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়ী।

সাগরতীরের সেই জমি এত দিন লবণের মাঠ ছিল। বর্ষায় হতো চিংড়ি চাষ। এখন সেখানে তৈরি হচ্ছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

মাতারবাড়ীর দক্ষিণে কুহেলিয়া নদী, পশ্চিমে ধলঘাটা ইউনিয়ন ও বঙ্গোপসাগর, উত্তরে কুতুবদিয়া চ্যানেল এবং পূর্বে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের বসতি। মাতারবাড়ী ইউনিয়ন, ধলঘাটা ইউনিয়নের আংশিকসহ এক হাজার ৪১৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে এখানে স্থাপন করা হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৩৭ কোটি টাকার মধ্যে ৮৫ শতাংশ পরিশোধ করা হয়েছে।

গত শনিবার নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিকরা বেড়িবাঁধ ও প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের কাজ করছে। ট্রাক ও বুলডোজার নিয়ে তারা ব্যস্ত। উত্তর-পশ্চিম দিকে কুতুবদিয়া চ্যানেলে প্রকল্পের মালামাল বোঝাই কয়েকটি জাহাজ নোঙর করা রয়েছে। জাহাজ থেকে নির্মাণকাজে ব্যবহারের মালামাল নামানো হচ্ছে। পশ্চিমে ধলঘাটা ইউনিয়নের সীমানা নিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রশস্ত বেড়িবাঁধসহ সড়ক। উত্তর দিকেও নির্মিত হয়েছে সড়কসহ বেড়িবাঁধ। পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ বিশাল আকৃতির পাইপলাইন বসানো হচ্ছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদ আলম বলেন, বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করার জন্য পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। সাগরের তলদেশের বালু দিয়ে প্রকল্প এলাকাটি ৩০ ফুট উঁচু করে ভরাট করা হবে। এ ছাড়া সাগরের তলদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়লাভর্তি জাহাজ ভেড়ানোর জন্য জেটি করা হবে।

এদিকে প্রকল্প এলাকায় অফিস নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে কয়েক দিন আগে। দক্ষিণ পাশে কুহেলিয়া নদীর পারে সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকারী সিনাম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রকৌশলী মাসুদ রানা বলেন, সাত তলাবিশিষ্ট ভবনের আপাতত তিন তলা পর্যন্ত আগামী বছরের মার্চের মধ্যে নির্মাণ করা হবে। ভবন তৈরি হলে কোল পাওয়ার ও জাপানি প্রতিষ্ঠান পেনটা ওশ্যান লিমিটেড পুরোদমে কাজ শুরু করবে।

বর্তমানে কুহেলিয়া নদীতে ভাসমান একটি জাহাজে রয়েছে প্রকল্পের অফিস। বিশাল আকারের জাহাজে নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এতে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতার জেনারেটর। ২৫ জন জাপানি নাগরিক এতে বাস করেন। বর্তমানে ৪৭ জন জাপানি রয়েছেন প্রকল্পের কাজে। বিদেশি নাগরিকসহ সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ২০ জন পুলিশ নিয়ে একটি ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া আনসার সদস্য রয়েছেন ৭৩ জন। আনসার কমান্ডার ইলিয়াছ খান বলেন, ‘প্রকল্পের চারদিকে আমাদের সদস্যরা দিনরাত পাহারায় নিয়োজিত রয়েছেন। ’

প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল্লাহ। তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে আরো একটি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এক হাজার ২০০ একর। প্রকল্পটির অধিগ্রহণ করা একরপ্রতি জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। অথচ জাইকা প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে একরপ্রতি ১৩ লাখ টাকা।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মহেশখালীর বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন, একই ইউনিয়নের জমি নিয়ে এ রকম বৈষম্য মেনে নেওয়া যায় না। দুটি প্রকল্পের জমি লবণ ও চিংড়ি চাষ এবং নাল শ্রেণির। তাই বৈষম্য না করে একরপ্রতি ৩৪ লাখ টাকা করে দিতে হবে।

মহেশখালী পৌরসভার মেয়র মকছুদ মিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে মহেশখালী দ্বীপকে বাছাই করেছেন। এই দ্বীপে চারটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

মাতারবাড়ীর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শওকত ইকবাল মুরাদ আক্ষেপের সুরে বলেন, একসঙ্গে এতগুলো তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করায় এলাকায় মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী শুধু তাদের লবণ ও চিংড়ি চাষের জমি হারায়নি, হারিয়েছে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশাও।

মাতারবাড়ী পুনর্বাসন প্রকল্পের দলনেতা তাজুল ইসলাম বলেন, যাঁরা জমি এবং পেশা হারিয়েছেন, তাঁদের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কারণে যেসব বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত্ত হয়েছে তাদের নানাভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এমনকি এসব পরিবারের জন্য এককালীন কিছু সাহায্যেরও ব্যবস্থা করা হবে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আলী হোসেন বলেন, জাইকা প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা অনেক আগেই নির্ধারিত ছিল। এমনকি এ পরিমাণ টাকা পরিশোধ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে জমিও হস্তান্তর করা হয়েছে। তাই আরো টাকা বাড়ানোর সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।


মন্তব্য