kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দশ বছরের মেয়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা

♦ মুরাদনগরে সালিসে ধর্ষণের বিচার
♦ বিয়ে, তালাক ও জরিমানার সিদ্ধান্ত

মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দশ বছরের মেয়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা

ধর্ষক হেলাল

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী (১০) সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। এ ঘটনা জানাজানি হলে ১৫ দিন আগে গ্রাম্য সালিসে ধর্ষণে অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রসবের পর সন্তানটি যুবক নিয়ে যাবে। এরপর যুবক মেয়েটিকে তালাক দেবে। বিনিময়ে মেয়েটি পাবে দুই লাখ টাকা।

মেয়ের মা অভিযোগ করে বলেন, ‘গত মাসে হঠাৎ করে মেয়ের শারীরিক পরিবর্তন চোখে পড়ে। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার তাকে চেকআপ করে বলেন, সে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই খবর পেয়ে আমরা হতভম্ব হয়ে গেছি। মেয়ের কাছে ঘটনা জানতে চাইলে সে বলে, বেশ কিছুদিন আগে এক বিয়ে বাড়ি থেকে রাতে ফিরছিল। পথে মো. হেলাল (মৃত আবুল কাশেমের ছেলে) তাকে নির্যাতন করে। ঘটনা জানাজানি হলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ভয়ে সে কারো কাছে এ বিষয়ে মুখ খোলেনি। ’

তিনি জানান, মেয়েটি হেলালের দোকানের পাশ দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করত। এ সুযোগে তাকে নানান কিছু উপহার দিত। হেলাল বলত, ‘আমি তোমাকে আমার ছোট বোনের মতো আদর করি। ’ মেয়েটি না বুঝে তার কাছ থেকে এটা সেটা নিত। মা আরো বলেন, ‘এ সরলতার সুযোগ নিয়ে আমার ছোট্ট মেয়ের বড় সর্বনাশ করেছে সে। আমি মেয়ের নিরাপত্তাসহ ঘটনার সঠিক বিচার চাই। ’

মেয়েটি জানায়, ওই রাতে তাকে পেছন থেকে ডাক দিলে সে ভয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়ে তাকে নির্যাতন করে হেলাল। এ ঘটনা প্রকাশ করলে তাকে ও তার পরিবারের লোকজনকে হত্যার হুমকি দেয়।

মেয়ের দাদা বলেন, ‘ঘটনা জানার পর থানায় মামলা করতে যাচ্ছিলাম। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মেম্বার রব মিয়া ও রবিউল আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধান করার আশ্বাস দেয়। অন্যথায় সমাজ ছাড়া করার ভয় দেখায়। তাদের কথামতো পনের দিন আগে সালিসে বসি। তারাই বিচারে রায় দেয়, হেলাল মেয়ের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেবে, মেয়েকে বিয়ে করবে, প্রসবের পর সন্তান নিয়ে যাবে এবং তালাক দিয়ে দেবে। গ্রাম্য সালিস মোতাবেক হেলাল দুই লাখ টাকা রব মেম্বারের কাছে দিয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো টাকা-পয়সা পাইনি। আমরা মামলা করতে থানায় যেতে পারি না। এখন তারা বিষয়টি বিভিন্নভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ’

অভিযুক্ত হেলাল নির্যাতনের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ওই মেয়ের গর্ভের সন্তানের বাবা আমি। স্থানীয়ভাবে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা আমি মেনে নিয়ে দুই লাখ টাকা রব মেম্বারের হাতে দিয়েছি। ’ স্থানীয় সূত্র জানায়, রব মেম্বার, হান্নান, আব্দুল খালেক, রুহুল আমিন ও আবুল কাশেমসহ আরো অনেকে ছেলের পক্ষ নিয়ে বিষয়টি সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করেন। তবে আবুল কাশেম বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউপি সদস্য রব মিয়ার বাড়ি গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মেয়েটির বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘সে আমার স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বেশ কিছু দিন স্কুলে না এলে খবর নিয়ে জানতে পারি সে অসুস্থ। পরে লোকমুখে শুনি, সে অন্তঃসত্ত্বা। ’

রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, ‘ঘটনাটি আমি লোকমুখে শুনেছি। বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এলাকায় একাধিকবার সালিস হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, সেটাই আমি চাই। ’

মুরাদনগর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। তবে আমি নিজ উদ্যোগে বিষয়টি জানার জন্য একজন উপপরিদর্শককে দায়িত্ব দিয়েছি। ঘটনা সত্য হলে মেয়েটিকে সব রকমের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। ’

মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত ইউএনও) মোসাম্মৎ রাশেদা আক্তার বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। বিষয়টি আমি দেখতেছি। ’


মন্তব্য