kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বুনো হাতি মারতে বন্দুক চায় ওরা

ঝিনাইগাতীতে আরো এক নারী নিহত

শেরপুর প্রতিনিধি   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘আত্তি পাক্কা বিল্ডিংও মানছে না। ঘরের দরজা ভাইঙ্গা যাইয়া খাডের নিচে লুহাই থাহা আমার মায়েরে মাইরালাইছে।

কেউ আত্তি ফিরাইতে পারব না। সরহারের কাছে বন্দুক চাই। অয় আত্তি থাকবো, নাইলে আমরা থাকমু। মায়েরে ফিরাইয়া দেও, নাইলে বন্দুক দেও, গুলি কইরা সব আত্তি মাইরা ফালাইমু। ’ এসব বলে আর্তনাদ করছিলেন হাতির আক্রমণে নিহত আয়াতন নেছার মেয়ে শরিফা বেগম।

গতকাল শনিবার ভোর ৪টার দিকে ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচা গ্রামে বুনো হাতির আক্রমণে মোমেনা বেগম (৬০) নামের ওই নারী নিহত হয়েছেন। ঘরে ঢুকে বুনো হাতি তাঁকে পায়ে পিষ্ট করলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে বুনো হাতির আক্রমণে পানবর গ্রামের গৃহবধূ আয়তন নেছাসহ তিনজন এবং ১০ অক্টোবর পশ্চিম বাকাকুড়া গ্রামে একজন নিহত হয়। গত পাঁচ দিনে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের দুই নারীসহ পাঁচজন বুনো হাতির আক্রমণে নিহত হয়।

‘যে জনগণের কথা সরকার ভাবে না, সে জনগণ না থাকলে সরকার কিয়ের ভোট পাব? আত্তির ব্যবস্থা সরকার কিয়ারে করে না? জনগণ তো মইরা শ্যাষ হইয়া গেল। আমরা গরিব মানুষ আত্তির অত্যাচারে গেরাম ছাইরা কই যামু, কী খামু?’ কথাগুলো বলছিলেন দুধনই গ্রামে হাতির আক্রমণে নিহত কালা জহুরুলের বোন খোদেজা বেগম।

বুনো হাতির আক্রমণে গত তিন মাসে বাবা ও চাচাকে হারিয়েছেন কাংশা ইউনিয়নের দুধনই গ্রামের পল্লী পশু চিকিৎসক মো. ফরিদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার তাঁর চাচা আব্দুল হাই হাতির আক্রমণে মারা যান। এর আগে গত ২২ জুন তাঁর বাবা রুস্তম আলী নিহত হন। তিনি নিজেও তখন হাতির হামলায় গুরুতর আহত হন।

ফরিদুজ্জামান কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘সরকার মানুষের কোনো মূল্য দিচ্ছে না। দিন দিন আমাদের সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামে বুনো হাতি আক্রমণ চালিয়ে আমাদের জীবনহানি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, ফসলহানির ঘটনা ঘটালেও সরকার নিশ্চুপ। আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। ’ তিনি আরো বলেন, ‘হাতির আক্রমণে মানুষ মরলে বন বিভাগ এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা দেয়। কিন্তু আমরা এভাবে মরতে চাই না, টাকাও চাই না। আমাদের দাবি, সরকার এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করুক। প্রয়োজনে বিডিআর-পুলিশ দিয়ে গুলি করে হাতি তাড়ানোর ব্যবস্থা করা হোক। ’

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরের কোনো স্বজনের বাড়িতে অবস্থান নিচ্ছে ঝিনাইগাতী সীমান্তের লোকজন। বেঁচে থাকাই এখন মুখ্য, বাড়িঘর দিয়ে কী হবে, জানালেন কেউ কেউ। জীবন বাজি রেখে হাতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে তারা। সন্ধ্যা নামতেই হাতির সঙ্গে তাদের যুদ্ধ শুরু হয়। অব্যাহত হাতির হামলায় হুমকির মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাহাড়ের জনজীবন। পানবর এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার রহমত আলী জানান, আগে রাতে টর্চ বা মশাল জ্বালিয়ে নিজেরা পালাক্রমে পাহারা দিতেন। কিন্তু এখন আলো দেখলেই দূর থেকে হাতি তেড়ে আসে। বর্তমানে হাতি তাড়ানোর কোনো উপায় পাওয়া যাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে করণীয় কী জানতে চাইলে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম রেজা জানান, হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। সরকার ইতিমধ্যে হাতির আক্রমণ রোধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে হাতির আক্রমণ অনেকটা কমে আসবে। সীমান্তে সম্প্রতি হাতি অনেক উগ্র হয়ে উঠেছে। ফলে প্রায় রাতেই হাতির আক্রমণে মানুষ মারা পড়ছে।

আরো এক নারী নিহত : এদিকে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের তাওয়াকুচা গ্রামে বুনো হাতির আক্রমণে মোমেনা বেগম (৬০) নামের আরেক নারী নিহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার ভোর ৪টার দিকে ওই ঘটনা ঘটে। নিহত মোমেনা ওই গ্রামের মৃত ফজল হকের স্ত্রী।

বন বিভাগের তাওয়াকুচা বিট কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম বলেন, সন্ধ্যার পর পাহাড় থেকে নেমে আসা বুনো হাতির তাণ্ডব শুরু হলে ওই বিধবা নিজ ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে লুকিয়ে ছিলেন। কিন্তু একটি উন্মত্ত হাতি ঘর থেকে তাঁকে শুঁড় দিয়ে ধরে এনে পায়ে পিষ্ট করলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।


মন্তব্য