kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ

খাদ্য বিভাগেই ‘খাদককর্তা’

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খাদ্য বিভাগেই ‘খাদককর্তা’

বরগুনা : সদর উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক ও গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোশারেফ হোসেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

মো. মোশারেফ হোসেন। বরগুনা সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

ওই প্রতিষ্ঠানের খাদ্য পরিদর্শকও তিনি। গত ১২ মাসে ধান-চাল-গম সংগ্রহের আড়ালে তিনি লুটে নিয়েছেন কোটি টাকা। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এ বছরের জুন ও জুলাইয়ে ন্যায্যমূল্যে স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে ৫৯২ মেট্রিক টন বোরো ধান কেনে খাদ্য বিভাগ। বরগুনার কৃষি বিভাগ ও জেলা কৃষক অ্যাসোসিয়েশন নিশ্চিত করেছে একজন কৃষকের কাছ থেকেও ধান কেনেননি ওই খাদ্য পরিদর্শক। তাহলে প্রশ্ন, খাদ্য বিভাগ এত ধান কিনল কোথা থেকে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রতারণার মাধ্যমে সরকারের কোটি টাকা লোপাটের আদ্যপান্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সারা বছর রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে চাষবাস করে কৃষক। সেই কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে তাদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের। এবার বরগুনায় বোরো ধানের আবাদ তুলনামূলক কম। এ সুযোগে স্থানীয় ঠিকাদারদের যোগসাজশে বরিশালের উজিরপুর ও বানারীপাড়া হাট থেকে নিম্নমানের ধান কিনে তা মজুদ করেন মোশারেফ। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি হাতিয়ে নেন প্রায় অর্ধ কোটি টাকা।

মোশারেফের এসব দুর্নীতির প্রত্যক্ষ সাক্ষী খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) জানান, ধান-গম কেনার জন্য ওজন, মান ও মজুদসংক্রান্ত সনদ (ডাব্লিউকিউএসসি) সংরক্ষণ করতে হয়। নিয়মানুযায়ী এতে থাকতে হয় সংশ্লিষ্ট কৃষকের স্বাক্ষরও। বরগুনা সদর উপজেলা খাদ্য বিভাগের এ বছরের ধান ও গম কেনার ওই সনদ নিরীক্ষা করলে দুর্নীতির সব প্রমাণ মিলবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘জাল সনদ বানিয়ে তা সংরক্ষণ করা হয়েছে। আমার চোখের সামনে কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্য পরিদর্শকের কক্ষে বসে কৃষকের জাল স্বাক্ষর দিয়ে ডাব্লিউকিউএসসি তৈরি করেছেন। ’

ওই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, এসব দুর্নীতিতে গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি সহযোগিতার জন্য মোশারেফ তাঁর বাবা মো. সেলিম ও ছোট ভাই মামুনকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনজনের যৌথ অনিয়মের সামনে অধস্তন কর্মচারীরা কিছু বলার সাহস পায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলা খাদ্য বিভাগের আরেক কর্মচারী জানান, ২৩ হাজার টাকা দরে প্রতি টন ধান কিনেছেন মোশারেফ। কিন্তু বাস্তবে তিনি ধান কিনেছেন টনপ্রতি ১২-১৩ হাজার টাকা দরে, যা ছিল বাজারের সর্বনিম্নমানের ধান। এতে টনপ্রতি ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ হিসেবে ৫৯২ মেট্রিক টন ধান কেনার আড়ালে তিনি অর্ধ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করেছেন। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, এর আগে এই বছরের মার্চে একই প্রক্রিয়ায় ২৭৫ মেট্রিক টন গম কেনার আড়ালে মোশারেফ প্রায় ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।

এদিকে যেসব কৃষকের কার্ড ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে এসব দুর্নীতি করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এবার বোরো ধান উৎপাদন করেননি। এমনকি খাদ্য বিভাগের কাছে ধান বিক্রি করেননি। সদর উপজেলার মনসাতলী গ্রামের কৃষক বিমল চন্দ্র দাস, যাদব চন্দ্র দাস ও রতন চন্দ্র দাস জানান, কয়েক মাস আগে বরগুনার লাকুরতলার খোকন ডিলার তাদের কার্ড ও ব্যাংকের চেক নিয়েছিলেন। তাঁরা কিভাবে কী করেছেন তা তাঁরা জানেন না।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৮ জুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ঝালকাঠির আমুয়া খাদ্য গুদামে ছিলেন মোশারেফ। গত বছরের ১১ আগস্ট তিনি বরগুনায় যোগ দেন। এর পর থেকে একের পর এক দুর্নীতি করে যাচ্ছেন মোশারেফ। তাঁর বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া গ্রামে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় নাচনাপাড়া এবং রাজধানী ঢাকায় কোটি টাকার জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। এ ছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে তাঁর অঢেল সম্পদ।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে সদর উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক ও বরগুনা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, ‘সব নির্দেশনা মেনে যথাযথভাবে এসব ধান ও গম কেনা হয়েছে। ’ তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।

বরগুনা জেলা কৃষক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে আজাদ বাবলু বলেন, ‘স্থানীয় কোনো কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনেনি খাদ্য বিভাগ। উপজেলা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে ১৯৭ জন কৃষকের কৃষি কার্ড ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে এ দুর্নীতি করেছেন খাদ্য পরিদর্শক মোশারেফ। ’ বরগুনা জেলা কৃষক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক মশিউর রহমান সিহাব বলেন, ‘যেসব কৃষকের কাছ থেকে ৫৯২ মেট্রিক টন ধান কেনা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে, তার তালিকা ধরে যথাযথ তদন্ত ও অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসবে প্রতারণার আসল চিত্র। ’

বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাইনুর আজম খান বলেন, ‘বরগুনায় বোরো আবাদের পরিমাণ একেবারে নগণ্য। আমার জানা মতে, কোনো কৃষক খাদ্য বিভাগের কাছে বোরো ধান বিক্রি করেনি। ’

সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘ধান গম কেনার দায়িত্ব খাদ্য পরিদর্শকের। আমি স্টক দেখে শুধু ধানের পেমেন্ট (টাকা) দিয়েছি। এর বেশি কিছু জানি না। ’

বরগুনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু অনিয়মের কথা শুনেছি। সেসব অনিয়ম তদন্তের জন্য বামনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. এনায়েত হোসেন মোল্লাকে সভাপতি করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে তদন্ত চলছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য