kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ছয় সপ্তাহে সাতজনের মৃত্যু

গারো পাহাড়ে থামছেই না বুনো হাতির তাণ্ডব

শেরপুর প্রতিনিধি   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শেরপুর সীমান্তের গারো পাহাড় এলাকায় বুনো হাতির আক্রমণে মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে নারীসহ তিনজন নিহত হয়েছে।

গত ছয় সপ্তাহে স্থানীয় কাংশা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বুনো হাতির আক্রমণে সাতজন নিহত হয়েছে।

স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি জনবসতিতে এখন প্রতি রাতেই আক্রমণ চালাচ্ছে বুনো হাতির দল। তাতে হতাহত হচ্ছে নিরীহ বহু মানুষ। সেই সঙ্গে হাতির তাণ্ডবে ঘর-বাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত পাহাড়ি জনপদের অধিবাসীরা দিন দিন জান-মাল, ঘরবাড়ি, ফসলাদি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে আরো নিঃস্ব হচ্ছে। তারা বলছে, দিন দিন হাতির আক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে পাহাড়ে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী আদিবাসী ও বাঙালিদের ভিটেমাটি এবং ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে ৪০-৫০টি বুনো হাতি পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে এসে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের পানবর ও দুধনই গ্রামে তাণ্ডব চালায়। একপর্যায়ে এরা বসতবাড়িতে তাণ্ডব চালাতে থাকে। এ সময় ঘরে লুকিয়ে থাকা পানবর গ্রামের ছুরত আলীর স্ত্রী আয়তন নেছা (৪৬), শাহ মাহমুদের ছেলে জহুরুল হক ওরফে কালা জহুরুল (৩৫) ও দুধনই গ্রামের আয়াতুল্লাহর ছেলে আব্দুল হাইকে (৪০) বুনো হাতি শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ঘর থেকে বের করে এনে পায়ে পিষ্ট করলে ঘটনাস্থলেই তাঁরা নিহত হন। এ সময় আরো চারজন আহত হন। তা ছাড়া পাঁচটি ঘরবাড়ী ও কয়েক একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে গত সোমবার রাতে বুনো হাতির আক্রমণে ওই ইউনিয়নের আদিবাসী কৃষক বকাকুড়া গ্রামের হিরা মারাকের ছেলে বাঁশিরাম চাম্বুগং মারা যায়। এর কয়েক দিন আগে ২২ ও ২৬ সেপ্টেম্বর কাংশা ইউনিয়নেরই ছোট গজনী ও পশ্চিম বাকাকুড়া এলাকায় ঘরবাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় ললেন কুবী ও টিবিরন বেওয়া নামের দুজনকে পায়ে পিষ্ট করে মেরে ফেলে। আরো দুজন আহত হয়। তা ছাড়া গত ১ সেপ্টেম্বর শ্রীবরদী উপজেলার সিংগাবরুনা ইউনিয়নের ঝোলগাঁও গ্রামে দুদু মিয়া নামের এক কৃষক হাতির আক্রমণে নিহত হন।

এদিকে শুক্রবার দুপুরে শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল হক চান হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরবেন এবং এ এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানাবেন। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, বিএসএফ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বন্ধ করে দেওয়ায় ভারতীয় এসব বুনো হাতি ওপারে যেতে না পেরে এপারে উন্মত্ত আচরণ করছে। তাতে আমাদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ জন্য বিডিআর-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক করে হাতিগুলো ওপারে যেতে ভারতীয় সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছি। ’

বন বিভাগের হিসাব মতে, গত ৬ সপ্তাহে সীমান্তের ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার পাহাড়ি জনপদে হাতির আক্রমণে সাতজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নেই মারা গেছেন ছয়জন। এখন হাতির আক্রমণের ভয়ে পাহাড়ি জনপদের আদিবাসী-বাঙালিরা নির্ঘুম রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে নিরুপায় হয়ে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগ। বুনো হাতির হাত থেকে জানমালের ক্ষতি ঠেকাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে নেওয়া কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। ইতিমধ্যে জেলার হাতি উপদ্রুত তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় আট হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে। পাশাপাশি ঘরবাড়ি ছেড়েছে শতাধিক পরিবার। কিন্তু ওই সব পরিবারের সরকারিভাবে আজও কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি। তারা এখন পাহাড় ছেড়ে এসে কেউ খাস জমিতে, কেউ বা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কাংশা ইউনিয়নের গজনী বিটের বন সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মো. দুলাল মিয়া বলেন, ‘দিন দিন হাতির আক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে পাহাড়ে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী আদিবাসী ও বাঙালিদের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হওয়ার অবস্থা হয়েছে। ’

তবে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা আশার বাণী শুনিয়ে জানান, হাতির আক্রমণ থেকে পাহাড়িদের রক্ষা করতে ইতিমধ্যে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। জেলা বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, কিছু এলাকায় হঠাৎ বুনো হাতির আনাগোনা বেড়ে গেছে। ঘটছে হতাহতের ঘটনাও। বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

 


মন্তব্য