kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জেলর দেখাচ্ছেন ‘অন্ধকার পথ’

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জেলর দেখাচ্ছেন ‘অন্ধকার পথ’

‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’—এই মন্ত্র বাংলাদেশ কারা বিভাগের। তবে মেহেরপুর জেলা কারাগার চলছে উল্টো স্রোতে।

কারাগারটির জেলর (কারাধ্যক্ষ) শেখ আখতার হোসেন দেখাচ্ছেন ‘অন্ধকার পথ’। আলোর পথ দেখানোর মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে কারাগারের বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, শৃঙ্খলা, বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ, তাদের যথাযথ বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা এবং আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কারাগার পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উল্টো ছবি মেহেরপুর জেলা কারাগারের।

বন্দিদের মধ্যে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন, প্রতিবাদী বন্দিদের নির্যাতন, ফাইল কাটা (নতুন আসামিকে ওয়ার্ডে স্থানান্তর) ও অবৈধভাবে ভিআইপি (কারাগারের ভেতরে) সাক্ষাতের জন্য অতিরিক্ত টাকা আদায়, সাক্ষাত্প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুর কারাগারের জেলর শেখ আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে। কয়েদি বন্দিদের পাহারা ও ম্যাট (এক-তৃতীয়াংশ জেল খাটা আসামি) বানানোর নামেও জনপ্রতি এক-দুই হাজার টাকা নেন তিনি। এসব করে তিনি মাসে ‘আয়’ করেন চার-পাঁচ লাখ টাকা। মাসখানেক আগে ২২ কারারক্ষী স্বাক্ষর করে কারা মহাপরিদর্শকের কাছে এ লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের অনুলিপি উপ-কারা পরিদর্শক (খুলনা) ও জেলা প্রশাসকের কাছেও পাঠিয়েছেন তাঁরা। তবে এখনো জেলরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিন কারারক্ষীকে বিভিন্ন জেলায় ‘শাস্তি’ হিসেবে বদলি করা হয়েছে জেলরের সুপারিশে। বাকি ১৯ কারারক্ষীর ওপর নেমে এসেছে নির্যাতনের খড়্গ।

মেহেরপুর জেলা কারাগারে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। পরে এ ব্যাপারে কথা বলতে জেলর শেখ আখতার হোসেনের সঙ্গে দুইবার দেখা করার কথা জানালেও তিনি দেখা দেননি। তিনি জেল সুপারের সঙ্গে কথা বলতে এক কারারক্ষীকে দিয়ে এ প্রতিবেদককে জানান। পরে এ প্রতিবেদন লেখার সময় তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে এক কারারক্ষী ধরে বলেন, জেলর কারাগারের ভেতরে আছেন। বিষয়টি জেলরকে জানানোর কথা বললেও পরে আর তিনি যোগাযোগ করেননি।

অবৈধভাবে দর্শনার্থীদের ভিআইপি সাক্ষাৎ : বন্দিদের সঙ্গে ভিআইপি সাক্ষাৎ করতে চাইলে দর্শনার্থীদের কারাগারের ভেতর ঢুকিয়ে ৫০০ টাকা করে নেন জেলর অনুসারী কারারক্ষী (এর ভিডিও ক্লিপ সংরক্ষিত আছে প্রতিবেদকের কাছে)। অথচ কারাবিধিতে ভিআইপি সাক্ষাতের বিধান নেই। পরে বিষয়টি নিয়ে কারারক্ষীরা আপত্তি জানালে গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভিআইপি সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারারক্ষী।

ক্যান্টিন থেকে মাসোয়ারা : কারাগারের ভেতরের ক্যান্টিন থেকে বন্দিদের মাঝে ১০ শতাংশ লাভে পণ্য বিক্রির নির্দেশনা থাকলেও বিক্রি করা হয় ৩২ থেকে ৬০ শতাংশ লাভে। জেল কম্পাউন্ড এলাকায় কারারক্ষীদের পরিচালিত (বাইরের) ক্যান্টিন থেকে বন্দিদের স্বজনরা কোনো খাবার দিতে চাইলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। বাইরের ক্যান্টিন থেকে জেলরকে প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা করে মাসোয়ারা দিতে হয়। জেলর অনুসারী কারারক্ষী মামুন হোসেন দায়িত্বে রয়েছেন হাজতি ও মুক্তি শাখায়। তিনি জেলরের নির্দেশে জামিনের অতিরিক্ত আসামির নাম লিখে তালিকা তৈরি করেন। পরে এই আসামিদের নাম-ঠিকানা ভুল আছে বলে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় : কোনো বন্দিকে দেখতে এলে প্রতি মোবাইল ফোনসেট রাখার জন্য পাঁচ টাকা ও আসামিপ্রতি ১০ টাকা দিতে হয় দর্শনার্থীকে। এক কারারক্ষী জানান, জেলরের নির্দেশে মোবাইল ফোনসেটপ্রতি পাঁচ টাকা করে নেওয়া হয়। তবে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ফোনসেট রাখতে ও বন্দিদের দেখতে চাইলে কোনো টাকা দিতে হয়নি এ প্রতিবেদককে।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চান্দামারী গ্রামের মহিবুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করে জানান, তাঁর ছোট ভাই একটি হত্যা মামলায় কারাবাস করছেন। তাঁকে মাঝেমধ্যে দেখতে আসেন তিনি। দেখতে যতবার আসেন ততবার ১০ টাকা করে দিতে হয় কারারক্ষীকে। এ ছাড়া স্বজনরা বন্দিকে খাবার দিলে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া লাগে।

বন্দির সঙ্গে সাক্ষাত্প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ব্যাপারে জেলরের অনুসারী কারারক্ষী মামুন হোসেন বলেন, মসজিদের উন্নয়নের জন্য যে যা খুশি দেন, তাই নেওয়া হয়। অন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না।

প্রতিবাদী বন্দিদের নির্যাতন : কারাগারের ভেতরে বন্দিদের নিয়মমাফিক খাবার পরিবেশন করা হয় না। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে সেই বন্দিকে শারীরিক নির্যাতন করেন জেলর আখতার হোসেন। মাদক মামলায় দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি শহরের মল্লিকপাড়ার শেখ শাহী গত ২৪ সেপ্টেম্বর জেলরের অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ওই দিন থেকে তিন দিন তাঁর চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয় বলে কালের কণ্ঠকে জানান শাহীর ছোট ভাই মনিরুল ইসলাম। পরে গত ২৭ সেপ্টেম্বর শাহীকে মেহেরপুর থেকে যশোর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। শাহীকে যশোরে নেওয়ার সময় দেখা করতে গিয়ে এ ঘটনা শোনেন মনিরুল। পরে মনিরুল যশোর কারাগারে শাহীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে কারারক্ষীরা বলেন, মেহেরপুর থেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ অবস্থায় শাহীকে নিয়ে আশঙ্কায় আছে তাঁর পরিবার। এদিকে দুর্নীতি ও বন্দি (শেখ শাহী) নির্যাতনের অভিযোগে জেলর আখতার হোসেন ও তিন কারারক্ষীর বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার আদালতে একটি মামলা করেছেন মনিরুল ইসলাম।

কারারক্ষীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার : জেলা কারাগারে কর্মরত অধিকাংশ কারারক্ষীর সঙ্গে দুর্বব্যহার করেন জেলর আখতার হোসেন। তাঁর অত্যাচারে (গালি, বদলির হুমকি, অপছন্দের জায়গায় কাজে নিযুক্ত ইত্যাদি) অতিষ্ঠ কারারক্ষীরা। কয়েক কারারক্ষী বলেন, বর্তমান জেলরের অধীনে কাজ করা খুবই কঠিন। মনে হয়, তাঁরাই (কারারক্ষী) জেলখানায় বন্দি। জেলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় তিন কারারক্ষীকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। তাঁদের একজন শহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, গত ২৬ ডিসেম্বর মেহেরপুর কারাগারে জেলর শেখ আখতার হোসেন যোগ দেওয়ার পর থেকেই নানা অনিয়ম শুরু করেন। এসবের প্রতিবাদ ও কারা মহাপরিদর্শকের কাছে অভিযোগ করার কারণে তাঁকে প্রেষণে মাগুরা জেলা কারাগারে ও অন্য দুজনকে যশোরে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু বাকি ১৯ কারারক্ষী জেলরের রোষানলে পড়ে আছেন।

গত সোমবার যশোরে যোগ দেওয়া শহীদুজ্জামান বলেন, সাংবাদিক কারাগারে পরিদর্শনে এসেছেন জানার পর জেলর অভিযোগকারী ২২ জনের মধ্যে ১৯ কারারক্ষীকে ডেকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোদের সাংবাদিক বাপরা কিছুই করতে পারবে না। পারলে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে আয়। ’ শহীদুজ্জামান বলেন, এর আগে ভারপ্রাপ্ত জেল সুপারের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শুভ্রা দাস। তখন তিনি নানা অনিয়মের কারণে জেলর শেখ আখতার হোসেনকে তিনবার শোকজ করেছিলেন। এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত জেল সুপার ও জেল প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. আরিফ হোসেন বলেন, অভিযোগের সত্যতা আছে কি না সেটা যাচাই-বাছাইয়ের ব্যাপার রয়েছে। তা ছাড়া তাঁর কাছে কেউ অভিযোগ করেননি।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পরিমল সিংহ বলেন, ‘এ ধরনের একটি অভিযোগ পেয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জেলরের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

মেহেরপুর-মহাজনপুর সড়কের পাশে সদর উপজেলার খন্দকারপাড়ায় ৭.৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মেহেরপুর জেলা কারাগার। বর্তমানে এর বন্দিসংখ্যা তিন শতাধিক।


মন্তব্য