kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

শিক্ষক যখন ডিলার

জামালপুর প্রতিনিধি   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শিক্ষক যখন ডিলার

জামালপুরে ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণে নয়ছয় হচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষক ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন।

তাঁরা বিদ্যালয়ে না গিয়ে পাঠদানের সময় বাজারে যাচ্ছেন। হতদরিদ্রদের চাল ওজনে কম দেওয়াসহ কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ইসলাপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের চরবাজারের ডিলার গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে পারুল। তিনি ৪ নম্বর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। খুনের মামলায় আসামি হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। এ তথ্য গোপন করে ডিলার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সাপধরী ইউনিয়নের ডিলার খায়রুল মমিন সাপধরী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। উলিয়া বাজারে নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ডিলার ছাইদুর রহমান সোনামুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চালের ব্যবসা করছেন। যমুনার নদীভাঙন এলাকার শিশুদের পাঠদানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছেন। এতে ওই দরিদ্র অঞ্চলের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গেলে ডিলার মো. গোলাম মোস্তফা, আছাদুজ্জামান, ছাইদুর রহমান ও মৌলভী মোস্তফা জানান, গত সেপ্টেম্বরে গুদাম থেকে ৫০ কেজির বস্তায় তিন কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়েছে।

ইসলামপুর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, ‘ডিলারদের উপস্থিতিতে গুদাম থেকে চাল মেপে দেওয়া হয়েছে। গুদাম থেকে চাল কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ’

মেলান্দহ উপজেলার চরবানিপাকুরিয়া ইউনিয়নের ভাবকি বাজারের ডিলার বেলাল হোসেন, নলেরচর বাজারের ডিলার আলমগীর হোসেন ও আদ্রা ইউনিয়নের ডিলার মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, তাঁদেরকে গুদাম থেকে প্রতি বস্তায় তিন কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়েছে। তাই তাঁরা তালিকাভুক্ত হতদরিদ্রদের দুই কেজি করে কম দিয়েছেন।

এই উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘গুদাম থেকে প্রত্যেক ডিলার চালের বস্তা মেপে নিয়ে গেছেন। তাই ডিলারদের চাল কম দেওয়ার অভিযোগ ঠিক না। ’

ইসলামপুর উপজেলার গোয়ালেরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আইয়ুব আলী বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরিতে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা অনিয়ম করেছেন। এ কারণে সেপ্টেম্বরের চাল উঠিয়ে কাউকে না দিয়ে গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্বচ্ছ তালিকার অভাবে এখনো ওই চাল বিতরণ সম্ভব হয়নি। ’

মেলান্দহের শ্যামপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মেম্বার বালাম মণ্ডল বলেন, ‘গোবিন্দী গ্রামের ৪৫ জন তালিকাভুক্ত হতদরিদ্রের হাতে আজও কার্ড পৌঁছেনি। এ সুযোগে সেপ্টেম্বরে বরাদ্দ এক হাজার ৩৫০ কেজি চাল ডিলার আবু তাহের কালোবাজারে বিক্রি করেছেন। ’

ডিলার আবু তাহের বলেন, ‘চেয়ারম্যান তাঁর নিজের লোক দিয়ে ওই ৪৫টি কার্ডের চাল উত্তোলন করে নিয়েছেন। ’ তবে ইউপি চেয়ারম্যান সিরাতুজ্জামান সুরুজ বলেন, ‘যারা এখনো কার্ড পায়নি, খোঁজ নিয়ে তাদের কাছে কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। ’

প্রশাসন সূত্র জানায়, জামালপুর সদর উপজেলার মেষ্টা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডিলার আশরাফ ফারুকী রুকন গত ৪ অক্টোবর ৫০ কেজি ওজনের ৯৪ বস্তা চাল কালোবাজারে বিক্রি করেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন হাজিপুর বাজারে উপস্থিত হয়ে চাল জব্দ করে। এ সময় ডিলার পালিয়ে যান। এ ঘটনায় ডিলারের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা হয়েছে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ তদারকির জন্য সরকারিভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁদের মানছেন না ডিলাররা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন তদারকি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ের ছোট কর্মকর্তা। এদিকে ডিলাররা প্রত্যেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত স্থানীয় প্রভাবশালী। আমরা পেশাগত দায়িত্বের বাইরে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট আন্তরিক। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে প্রভাবশালী ডিলাররা আমাদের মানছেন না। তাই ডিলারদের অধিকাংশ তদারকি কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতে জোরপূর্বক চাল বিতরণের নামে সিংহভাগ চাল কালোবাজারে বিক্রি করছেন। আমরা প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। ’

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ‘শুরুতে গুদাম কর্মকর্তারা ডিলার ও চেয়ারম্যান-মেম্বারদের অনিয়ম দুর্নীতির প্রশ্রয় দিয়েছেন। ’

জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘সব কটি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ’


মন্তব্য