kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

রকমারি ছলচাতুরী!

চালের দেখা নেই, গরিবরা খাচ্ছে আটা

নড়াইল প্রতিনিধি   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রকমারি ছলচাতুরী!

গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামে ১০ টাকা কেজিতে গরিবদের জন্য চাল বিক্রি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এক মাস পার হলেও নড়াইলে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এ কর্মসূচি চালু করতে পারেনি প্রশাসন।

চালের দাম বেশি হওয়ায় যেসব হতদরিদ্র পরিবার আটা খাচ্ছে, তারা এ কর্মসূচি দেখে ভাত খাওয়ার আশা করলেও তা আপাতত পূরণ হচ্ছে না।

নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের চিত্রা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আকবর আলীর (৬০) পেশা ভ্যানচালক। তাঁর আয়ে পরিবারের ছয়জনের ভরণপোষণ। সংসার চালাতে গিয়ে কূল পান না এই প্রৌঢ়। তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে দেখছি, সারা দেশে ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি হচ্ছে। বড় আশা করেছিলাম, প্রতিদিন অন্তত পেট ভরে ভাত খেতে পারব। প্রধানমন্ত্রী সংসদে নানা ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অথচ আমরা এখনো সেই চাল চোখে দেখতে পারলাম না। মাঝেমধ্যে বাজার থেকে ৩৫-৩৬ টাকা দামে মোটা চাল কিনি। সব সময় তো আর পারি না। ২০-২২ টাকার আটাই আমাদের ভরসা। এখন প্রায় দিনই সবাই মিলে আটা খেয়ে থাকি। ’ এ জেলায় তাঁর মতো হাজার হাজার পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ মাস (সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, মার্চ ও এপ্রিল) জেলার ৩৪ হাজার ৫০৪ জন হতদরিদ্র মানুষ মাসে ৩০ কেজি চাল কেনার সুযোগ পাবে। যার মধ্যে লোহাগড়া উপজেলায় ১৫ হাজার ৮৪১, কালিয়া উপজেলায় ১০ হাজার ২০৪ এবং সদর উপজেলায় আট হাজার ৪৫৯ জন। ইতিমধ্যে চাল বিতরণের জন্য তিন উপজেলায় ৭৯ জন ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে নড়াইল সদরে ২৫, লোহাগড়ায় ৩২ এবং কালিয়ায় ২২ জন।

খাদ্য অফিস জানায়, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রথম চিঠি আসে গত ১০ মার্চ। ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ব্যাপারে ১৯টি চিঠি সংশ্লিষ্ট বিভাগে চালাচালি হয়েছে। কিন্তু কার্যত ডিলার নিয়োগ ছাড়া অন্য কোনো কাজ হয়নি।

সদরের শাহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন পান্না বলেন, ‘উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস থেকে তালিকা তৈরি করার কোনো চিঠি পাইনি। আমাদের ইউনিয়নে কতগুলো লোক এই সুবিধা পাবে তা আজও (১০ অক্টোবর) জানানো হয়নি। তাই হতদরিদ্র লোকের তালিকা তৈরি এখনো শুরু হয়নি। ’ তিনি আশঙ্কা করে বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি কার্যক্রম শুরু করতে আরো এক মাস সময় লেগে যাবে। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাইজপাড়া ইউনিয়নের একজন ডিলার বলেন, ‘উপজেলা থেকে আমাদের ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত হলেও চেয়ারম্যান-মেম্বাররা এখনো তালিকা তৈরি করতে পারেননি। তাই কবে নাগাদ চাল বিক্রি শুরু হবে, তা বলা মুশকিল। ’

নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাসিমা খাতুন বলেন, ‘আমরা ২৭ সেপ্টেম্বর ডিলার নিয়োগ করেছি। এখন ইউনিয়নগুলোতে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আশা করি আগামী সপ্তাহ থেকে চাল বিক্রি শুরু করতে পারব। ’

এদিকে লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউপির চেয়ারম্যান আকতার হোসেন বলেন, ‘মেম্বাররা হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরিতে অনেক সময় ব্যয় করেছেন। এ কারণে দেরি হচ্ছে। ’

লোহাগড়ার ইউএনও সেলিম রেজা বলেন, ‘আমার ১২টি ইউনিয়নের তালিকা তৈরি শেষ করা হয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস থেকে জানানো হয়েছে, কার্ড ছাড়া বিতরণ করা যাবে না। তাই দেরি হচ্ছে। কার্ড না এলেও আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে তালিকা অনুযায়ী চাল বিক্রি শুরু করব। ’ কালিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটির তালিকা (৮ অক্টোবর পর্যন্ত) তৈরি হয়েছে জানিয়ে ইউএনও মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘চারদিকে যেভাবে কার্ড বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে, তাতে চিন্তায় আছি। সঠিকভাবে যাচাই করে হতদরিদ্র লোক বাছাই করতে নির্দেশ দিয়েছি। এ কারণে তালিকা তৈরিতে দেরি হচ্ছে। ’

তালিকা, সরবরাহসহ সব কাজের দায়িত্বে থাকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। বিভাগীয় কর্মকর্তার বিদায়ী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাঁরা খুলনায় অবস্থান করছেন।

নড়াইল খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্রের সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রয়েছে। ডিও (সরবরাহ আদেশ) পেলেই আমরা চাল সরবরাহ করতে বাধ্য। ’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কার গাফিলতিতে এ চাল দিতে দেরি হচ্ছে, এটা অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে (ডিসি) জানানো হয়েছে। ’

নড়াইলের ডিসি মো. হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, ‘সেপ্টেম্বরে সরকারি আদেশ পাওয়ার পর থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে লোহাগড়া উপজেলার তালিকা তৈরি হয়ে গেছে। তবে কার্ড না পাওয়ায় বিক্রি শুরু হয়নি। চলতি সপ্তাহ থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে। ’

 

মন্তব্য