kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘২২ দিন গাঙে অবরোধ’

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, পিরোজপুর ও পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিনিধি   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘২২ দিন গাঙে অবরোধ’

উপকূলীয় নদনদীতে মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। আজ বুধবার থেকে টানা ২২ দিন বন্ধ থাকবে ইলিশ ধরা। এ কারণে গতকাল জেলেরা পার করেছে ব্যস্ত সময়। ছবিটি বরগুনার বামনার বিষখালী নদীর কলাগাছিয়া মোহনা থেকে তোলা। ছবি : দেবদাস মজুমদার

বিষখালী নদীর তীরের কলাগাছিয়া গ্রামের জেলে বরুণ দাস ১৫ দিন ধরে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। রাত দিন নদীতে কেটেছে সময়।

ইলিশ প্রজনন মৌসুম শুরুর আগে যদি বেশি মাছ ধরা যায় তাহলে পরবর্তী ২২ দিন তাঁকে বিপদে পড়তে হবে না। জেলে বরুণ দাস বলেন, ‘সরকার ২২ দিন গাঙে অবরোধ দেছে। এই ২২ দিন তো গাঙে নামতে পারমু না। মাছ বেশি পাইলে বাড়তি কিছু টাকা পামু। বেকার সময়টাতে কাজে লাগবে। ’

জেলে বরুণের আক্ষেপ, ‘নিষেধাজ্ঞা দেন আপত্তি নাই। তবে ২২ দিন বেকার সময়ে আমাদের সহায়তাও দেন। ’

শুধু এই জেলে নন, বরগুনা ও পিরোজপুর উপকূলীয় নদনদীতে মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত ইলিশ আহরণে ব্যস্ত সময় কেটেছে জেলেদের। ইলিশের প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ায় আজ ১২ অক্টোবর থেকে উপকূলীয় নদনদী ও সাগরে ইলিশ ধরা বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ২ নভেম্বর (২৭ আশ্বিন থেকে ১৮ কার্তিক) পর্যন্ত। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত ও বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ রক্ষায় সরকারের মৎস্য বিভাগসহ বন বিভাগ, পুলিশ, কোস্ট গার্ড ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে চালানো হচ্ছে প্রচার-প্রচারণা। মৎস্য বিভাগ জেলে সমাবেশে, মতবিনিময়সহ উপকূলীয় হাটবাজারে ইলিশ প্রজনন বিষয়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে ব্যানার ও বিলবোর্ড স্থাপন করেছে। প্রধান প্রজনন মৌসুমে বন্ধ থাকবে সব বরফকল। ঘাটে থাকতে হবে মাছ ধরার সব ট্রলার। নৌকা বন্ধ রাখারও কথা জানানো হয়েছে।

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখার সময়টি স্থানীয় ভাষায় ‘অবরোধ’ বলা হয়। অবরোধ শুরু হওয়ার আগে জেলেরা বেশ তৎপর থাকে যে কত বেশি ইলিশ আহরণ করা যায়। মঙ্গলবার শেষ দিন পর্যন্ত কোনো জেলেই বসে ছিল না। সারা দিন ছিল ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি । দিন-রাত বেশি মাছ ধরার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। অন্য দিকে ২২ দিনের অবরোধের কারণে ক্রেতারা আগেই ইলিশ কিনে ফ্রিজে তুলে রেখেছে। ফলে শেষ মুহূর্তে এসে উপকূলীয় হাট-বাজারে ইলিশের চাহিদা বেড়ে গেছে। এ কারণে ইলিশের দামও চড়া। জেলেরা জানায়, ২২ দিনের অবরোধে উপকূলের জেলেরা বেকার হয়ে পড়ার বিষয়ে সরকারি সহায়তার কথা বলা হলেও তাদের সহায়তার ব্যাপারে মৎস্য বিভাগ এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।

জানা গেছে, পিরোজপুরের বলেশ্বর ও বরগুনার বিষখালী নদীতে সবচেয়ে বেশি ইলিশ মাছ ধরা হয়। এর মধ্যে বিষখালীর ইলিশ স্বাদে সেরা। বলেশ্বর নদী সুন্দরবন উপকূলীয় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ও ভাণ্ডারিয়া, বরগুনার পাথরঘাটা এবং বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকার ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবাহিত। অন্য দিকে বিষখালী নদী বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার হরিণঘাটা থেকে ও ঝালকাঠি পর্যন্ত ১০৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবাহিত। এ দুই নদীতে সারা বছর জেলেরা ইলিশ মাছ ধরে থাকে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইলিশ সাগরেও ধরা হয়। তবে উপকূলীয় বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মতো এত সুস্বাদু নয়। ইলিশ সাগর জলে থাকলে উপকূলীয় নদনদীতে এসে ডিম ছাড়ে। গত বছর ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ বন্ধ ১৫ দিন করা হলেও এ বছর তা বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়েছে। আশ্বিনের পূর্ণিমায় এর প্রধান প্রজননকাল। ফলে এ সময় ইলিশ মাছ আহরণ বন্ধ রাখা জরুরি। তবে পাথরঘাটা বিএফডিসির পাইকারি বাজারের আড়তদার মো. নুরুল আমিন মনে করেন, ইলিশ রক্ষায় প্রজনন মৌসুম আরো এগিয়ে আনা উচিত। প্রধান প্রজনন মৌসুম (অক্টোবরের) আশ্বিনের পূর্ণিমার আগেই শুরু করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। এখনই মাছের পেটে ডিম দেখা যাচ্ছে। সাগরে মাছ শিকার করে ফিরে আসা জেলে মো. জুয়েল বলেন, এখন ধরাপড়া ছোট মাছেরও পেট ডিমে ভরা।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া বলেশ্বর নদের খেজুরবাড়িয়া জেলে পল্লীর জেলে মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘২২ দিন গাঙে (নদীতে) নামতে পারমু না। এ সময় কিভাবে চলবে জেলেদের, তার কোনো কিছু তো কেউ আমাগো জানায় নাই। আমাগো বেকার সহায়তা না দিলে চলে কেমনে?’

এ ব্যাপারে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান টেলিফোনে জানান, নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে মাথাপিছু ২০ কেজি চাল দেওয়া হবে। তবে এ ২২ দিনের মধ্যে সম্ভব কি না, তা বলা যাচ্ছে না। জেলায় ৩৪ হাজার ২১১ জনের জন্য বরাদ্দপত্র এসেছে যা ছয় উপজেলায় বণ্টন করা হবে।

পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের (বিএফডিসি) ম্যানেজার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এস্কান্দার আলী খান বলেন, ‘এ বছর ইলিশ আহরণ বেশি হয়েছে। র‌্যাব ও কোস্ট গার্ডের কড়া পাহারায় সাগর ও নদীতে ডাকাতের উপদ্র্রবও ছিল খুব কম। ট্রলারের শ্রমিকরা শূন্য ভাগি (যাদের কোনো বিনিয়োগ নেই) নিদেন পক্ষে তাঁরা এ মৌসুমে ৩০ থেকে ৭৫ হাজার হাজার টাকা উপার্জন করেছেন। ’


মন্তব্য