kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পিরোজপুর

এমপি আউয়ালের ‘সাম্রাজ্য’ আউলা

শিরিনা আফরোজ, পিরোজপুর   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এমপি আউয়ালের ‘সাম্রাজ্য’ আউলা

ছেলে ফেসবুকে বাবাকে কিং অব কিংস (রাজাদের রাজা) ঘোষণা দেন। বাবা রাজা হলে ছেলে রাজপুত্র।

এরপর ছেলে গঠন করেন ইউনাইটেড রয়েল ক্লাব (রাজকীয় যৌথ সমিতি)। পরপর দুইবার পিরোজপুর-১ (সদর-নেছারাবাদ-নাজিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার পর এ কে এম এ আউয়ালের চলাফেরা ছিল রাজার মতোই। স্ত্রী লায়লা ইরাদ ছিলেন ছায়ার মতো সব সময়ের সঙ্গী (রানি)।

একদিকে অর্থসম্পদ, অন্যদিকে ক্ষমতা—এলাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিরোধ্য। এমপি এলাকায় ঢুকলে বিশাল গাড়িবহর, ফুলে ফুলে সজ্জিত তোড়া, পুলিশি পাহারায় দেওয়া হতো সাদর সম্ভাষণ। ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান যা-ই হোক, এমপিকে সংবর্ধনা ও দামি উপঢৌকন দেওয়া ছিল রেওয়াজ। তাঁর তিন ভাইয়ের একজন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, একজন পৌর মেয়র, আরেকজন বাস মালিক সমিতির সভাপতি। সম্প্রতি এমপি আউয়ালের এই ‘সাম্রাজ্য’  হয়ে গেছে আউলা (বিশৃঙ্খল)।

এলাকাবাসী মনে করছে, হঠাৎ যেন প্রকৃতি বৈরী হয়ে উঠেছে। এমপির তিন ভাই তাঁর সঙ্গ ছেড়েছেন। এরপর ক্রিকেটের উইকেট পতনের মতো একে একে দলীয় নেতাকর্মী, একান্ত সহচর, এমনকি এলাকার জনসাধারণও তাঁর সঙ্গ ছাড়ছে। সিনেমার গল্পের মতো কালকের ‘রাজা’ যেন আজ ‘প্রজা’ বনে গেছেন।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত ৭ অক্টোবর এলাকায় আসেন এমপি। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের বিশাল গাড়িবহর ছিল না। তাঁকে কেউ শুভেচ্ছা জানাতে ফুল নিয়ে যায়নি। ভয়ে তাঁর সঙ্গে আসেননি স্ত্রী কিংবা ছেলে। তাঁর নিরাপত্তায় ছিল কয়েক প্লাটুন পুলিশ। যেখানে যাচ্ছেন সঙ্গে থাকছে কড়া পুলিশি পাহারা। এমনকি তাঁর অবস্থানের সময় বাসভবন ঘিরে থাকে পুলিশ।

বাড়ি আসার পর গত ৭ অক্টোবর কাউখালী উপজেলায় গিয়েছিলেন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে। তাতে দলীয় নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। পুলিশি পাহারায় তিনি কাউখালী ছাড়তে বাধ্য হন। পরে তিনি ভাণ্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া উপজেলায় গেলেও নেতাকর্মীদের বড় অংশ তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার ঠিকাদারি, দরপত্র, বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ, ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন এমপি ও তাঁর স্ত্রী। ভাইদের উপেক্ষা করে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে আনার চেষ্টা করছিলেন বড় ছেলে আব্দুর রহমানকে। এ কারণে রহমান ইউনাইটেড রয়েল ক্লাবের ছত্রচ্ছায়ায় মাঠ গোছাতে শুরু করেন। ছাত্রলীগসহ তরুণ সমাজের ওপর ছড়ি ঘোরাতে থাকেন। বয়সে বড় বা ছোট হোক সবাইকে ‘দাদাভাই’ ডাকতে বাধ্য করতেন। এ পরিস্থিতিতে প্রথম প্রতিবাদ করে ছাত্রলীগ। গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংগঠনটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে রহমানের ইয়াবা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এলাকায় ঢুকতে পারছিলেন না এমপি আউয়াল।

স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, এমপির কর্তৃত্ব ও দাম্ভিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সংগঠন থেকে বাদ দেন। জামায়াত-বিএনপির সমর্থিত নেতাকর্মীকে দলে ঢোকান। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে খেয়াল-খুশিমতো নিজের লোকদের সুপারিশ করেন। গুরুত্বপূর্ণ সব পদ ও পদবি নিজেদের দখলে রাখায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ ছিল আগে থেকেই।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এমপি আউয়াল ক্রমেই স্ত্রীনির্ভর হয়ে পড়েন। ভাইদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। গত আগস্টে এই দূরত্ব আরো গতি পায়। এ সময় এমপি তিন ভাইয়ের কাজে বাগড়া দেন। পৌর মেয়রের নিয়ন্ত্রণাধীন বলেশ্বর সেতু ও বেকুটিয়া ফেরিঘাটের ইজারা দখল করেন। বাস মালিক সমিতিতে হস্তক্ষেপ করেন। এ কারণে তিন ভাই তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। দলের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা এসে বিদ্রোহী ভাইদের পক্ষে থাকে। তারা পৌর মেয়রের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এ অবস্থা দেখে এমপির কাছের অনুসারী নেতাকর্মীরা ভিড় করে মেয়রের পক্ষে।

দলীয় সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ২২ বছর পর জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। এতে সভাপতি হন এমপি আউয়াল। তাঁকে বাদ দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতে যান ৭৪ সদস্যের কমিটির সাধারণ সম্পাদকসহ ৫৪ জন নেতা। এর নেতৃত্ব দেন পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক। এ ছাড়া দলীয় সব সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁর দুই ভাই পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান।

এসব বিষয়ে এমপি আওয়ালের ভাই ও পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক বলেন, ‘এমপি ও তাঁর স্ত্রীর স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অনিয়ম মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে এত দিন মুখ বুঝে ছিলাম। শুধু দলের নেতাকর্মীই না, আজ উনি জনবিচ্ছিন্ন। তাঁর সব অপকর্মের ভার আমি নিতে যাব কেন? তাই জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমাদের ব্যবসাবাণিজ্যে পর্যন্ত হাত দিচ্ছেন। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়ে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছি। ’

আরেক ভাই ও উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান খালেক বলেন, ‘এমপি, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের রাজত্ব জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই আজ ওনার পাশে নেতাকর্মী, জনগণ, ভাইবোন কেউ নেই। ’

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাকিম হাওলাদার বলেন, ‘আপনারা আজ এমপি আউয়ালের যা পরিস্থিতি দেখছেন, এ জন্য উনি নিজেই দায়ী। এত দিন ওনার একক সিদ্ধান্তে দল চলেছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন কখনো করেননি। ক্ষমতা হাতে পেয়ে অপব্যবহার করলে এর ফল তো ভোগ করতেই হবে। ’

এমপি আউয়াল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মনগড়া প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। তারা আমার লোকজনকে মারধর করলেও আমি কিছু বলি নাই। আমি আম্মার অসিয়ত (মায়ের নির্দেশ, ভাইদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা) অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি। ইনশা আল্লাহ, সব ঠিক হয়ে যাবে। ’


মন্তব্য