kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চকরিয়া

রাবার ড্যামের অশনিসংকেত

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রাবার ড্যামের অশনিসংকেত

ড্যামের একেবারে কাছ থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলায় কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর বাঘগুজারা পয়েন্টে নির্মিত দেশের বৃহত্তম রাবার ড্যাম হুমকির মুখে পড়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর বাঘগুজারা পয়েন্টে নির্মিত দেশের বৃহত্তম রাবার ড্যাম (বাঁধ, ব্যারাজ) হুমকিতে পড়েছে। ড্যামটির মাত্র ৫০ গজ দূরে শ্যালো মেশিন বসিয়ে নদীর তথা ড্যামের তলদেশ থেকে বালু তুলছে একটি চক্র।

এর আগে ড্যামটির আশপাশ থেকে বালু তোলায় রাবারের জোড়া ছিঁড়ে নদীতে ঢুকে পড়েছিল লবণ পানি। এবারও তেমনটি হলে শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানি ধরে রাখা যাবে না। তাতে ৪০ হাজার একর জমির চাষাবাদ ব্যাহত হবে। আর বর্ষাকালে ধসে যেতে পারে ড্যামসহ ওপরের সেতুটিও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাতামুহুরী নদীর বাঘাগুজারা পয়েন্টে রাবার ড্যামটির কাছ থেকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে এক মাস ধরে বালু তুলছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামা এলাকার খলিলুর রহমানের ছেলে বিএনপি নেতা নুরুল আমিন। তিনি দাবি করেন, ‘সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে সামান্য কিছু বালু তুলছি। এতে দোষের কি আছে? তা ছাড়া শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু না তুললে লাভ হবে না। এতে রাবার ড্যামের কেন ক্ষতি হবে?’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বালু উত্তোলনে জড়িত এক ব্যক্তি জানান, রাবার ড্যাম এলাকা থেকে তোলা বালু বিক্রির পর ওই টাকা থেকে পেকুয়া থানা পুলিশকেও দেওয়া হয়। তাই বালু তোলায় এ পর্যন্ত কোনো বাধা আসেনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নির্মিত বাঘগুজারা রাবার ড্যামটি ২৩৩ দশমিক ৫০ মিটার দীর্ঘ। ড্যামের তদারক আবদুর রহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ড্যামের কাছে শ্যালো মেশিন বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা অব্যাহত থাকলে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে ড্যামটি। এ অবস্থায় আগামী শুষ্ক মৌসুমে ড্যামের রাবার ফুলিয়ে নদীর মিঠাপানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ’

আবদুর রহিম জানান, গত মার্চ-এপ্রিলে একটি চক্র শ্যালো মেশিন বসিয়ে ড্যামের নিরাপদ দূরত্বের আশপাশ থেকে বালু তোলাতেও বারবার রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যায়। পরে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু এখন আরেকটি চক্র ড্যামের কাছ থেকে বালু তুললেও বাধা দেওয়ার যেন কেউ নেই। ফলে চক্রটি নির্বিঘ্নে বালু তুলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি পাউবো কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে।

পাউবো সূত্র জানায়, শ্যালো মেশিনে বালু তোলার কারণে গত মার্চের প্রথম দিকে ড্যামের তলানির বেইজের পাইলিংয়ের গোড়া থেকে মাটি সরে যায়। এ কারণে চার স্প্যানের মধ্যে দ্বিতীয় স্প্যানের রাবারের জোড়া ছিঁড়ে নদীতে লবণ পানি ঢুকে পড়ে। এরপর পাউবোর প্রকৌশলীর কয়েক দফা তৎপরতায় ছিঁড়ে যাওয়া রাবার জোড়া লাগানো হয়।

চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা এ টি এম জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জিয়া বলেন, ‘ড্যামটি নির্মাণের সময় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। এ কারণে নির্মাণের পর বারবার বিপর্যয় ঘটে। এর ওপর একেবারে কাছে মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হলে ড্যামটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ড্যামটি অকার্যকর হলে মিঠাপানির জন্য প্রায় ৪০ বছর ধরে কৃষককে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল, তা আবারও দেখা দেবে। চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার অন্তত ১৫টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার একর জমির চাষাবাদ চরম হুমকির মুখে পড়বে। সামনের শুষ্ক মৌসুমে ড্যামের রাবার ফুলিয়ে নদীর মিঠাপানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই ড্যামের আশপাশে বালু তোলা বন্ধে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ’

পেকুয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ চৌধুরী রাজু বলেন, ‘বাঘগুজারা রাবার ড্যামের ধরে রাখা মাতামুহুরী নদীর মিঠাপানি দিয়ে পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়নের কৃষকরা চাষাবাদ করে। অনেক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সেচ সমস্যা দূর করতে প্রায় ৪০ বছর পর ড্যামটি নির্মাণ করে। কিন্তু প্রতিবছর নানা কারণে ড্যামের রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যাওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত ওঠে। ড্যামটির স্থায়িত্ব ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ’

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফুর রশিদ খান বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই রাবার ড্যামের আশপাশের তলদেশ থেকে বালু তোলা যাবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

পাউবো কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, ‘বাঘগুজারা ড্যামের কাছ থেকে বালু উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে একজন প্রকৌশলীকেও ড্যামস্থলে পাঠানো হবে। ’

পাউবো জানায়, প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর পালাকাটা-রামপুর ও বাঘগুজারা পয়েন্টে দুটি রাবার ড্যামের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। পারিশা অ্যান্ড কম্পানি এবং ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্যাম দুটির নির্মাণকাজ শেষ করলে ২০১২ সালে উদ্বোধন করা হয়।


মন্তব্য