kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

‘আলু মানবী’

দিলীপ কুমার মণ্ডল ও এ কে এম শাহাদাত, নারায়ণগঞ্জ   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘আলু মানবী’

অন্ধকার ঝুপড়ি। সেখান থেকে ভেসে আসছে এক নারীর ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।

তিনি বাইরে আসতেই মনে হলো, তাঁর শরীরে গজিয়েছে অসংখ্য ‘আলু’। চোখ, নাকের ডগা ও পায়ের কিছু অংশ ছাড়া সারা শরীরে এই গুটি (চিকিৎসকের ভাষায় ইনোসেন্ট টিউমার) থাকায় লোকজন তাঁকে ডাকে ‘আলু মানবী’ বলে। দেড় যুগ ধরে তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন এই যন্ত্রণা।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গুতিয়াবো আগরপাড়ার আলু মানবীর প্রকৃত নাম হোসনে আরা বেগম (৭০)। স্বামী, ভিটেবাড়ি হারা হোসনে আরা অর্থাভাবে রোগটির চিকিৎসা করাতে পারছেন না। রোগ আর বয়সের কারণে প্রতিদিন তিনি বাইরেও বের হতে পারেন না। সপ্তাহে দু-এক দিন বাইরে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে কোনো রকমে চলছে তাঁর জীবন।

সম্প্রতি আগরপাড়ায় গেলে হোসনে আরা শোনান তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প। তিনি বলেন, ‘১৬ বছর বয়সে আমার বিয়া অয়। এর কয়দিন পরেই শইল্লে ছোট ছোট আঁচুলি (আঁচিল) দেহা দেয়। এর পর থেইক্যা গ্রামের ডাক্তর দেহাইছি। কিন্তু অসুখ বাড়া ছাড়া কমে নাই। অনেকে কইছে টিউমার। হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাইলে সাইরা যাইবগা। হোমিওপ্যাথি দেহাইলাম অনেক বছর। কামের কাম কিছু অয় নাই। শইল্লে ব্যথা। টানা ডাক্তর দেহাইয়া সোয়ামি (স্বামী) আরজু মিয়া তার ভিটেবাড়ি বিক্রি কইরা দেয়। পরে ডাক্তর কইল অপারেশন লাগব। ট্যাকার অভাবে অপারেশন করবার পারি নাই। প্রায় ১৭ বছর আগে সোয়ামি মারা যায়। পরে পোতেরে (ছেলে) লইয়া গুতিয়াবো গ্রামে ঠাঁই লই। এহন তো বাজান পোতেরই চলে না। ওর পোলাপান (ছেলেমেয়ে) আছে। সংসার আছে। আমারে দিব কই থেইক্যা। অহন বিভিন্নজনের থেইক্যা টেকা উডাইয়া ডাক্তর দেহাই। ’

হোসনে আরা কেঁদে বলেন, ‘আমি বাজান পোড়াকপালি। নাইলে ক্যান এমন অইব। সোয়ামিরে হারাইলাম। সোয়ামির ভিটেবাড়ি হারাইলাম। ঠিকমতন পেট ভইরা খাইবার পারি না। আর এমুন এক রোগ অইল, মানুষও কাছে (আসে) আহে না। ভালাও বাসে না। আর পোলাপানতে দেইহ্যা তো ডরায়। অহন মরবারও পারি না। খোদায় আমারে দুনিয়াত্তে লইয়া যাইতগা। এই যন্ত্রণা থেইক্যা মইরা যাওন অনেক ভালা। ’ তিনি বলেন, ‘যহন উপশহর অইব, তহন আমাগো ভিটাবাড়ি একোয়ার অয়। জায়গা কম থাহনে আমরা প্লটও পাইলাম না। কেন এই বোঝা আমার কপালে আইল, বুঝবার পারি না, বাজান। ’

হোসনে আরার ঘনিষ্ঠজন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হোসনে আরার শরীরে যখন আলুর মতো গোটা ওঠে তখন থেকেই ব্যথা লাগত। তিনি কোথাও গেলে সেখানে উত্সুক মানুষের ভিড় জমে। তাঁকে দেখতে বাড়িতেও প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে, জানান তাঁর ভাই সিরাজুল ইসলাম।

স্থানীয়দের ভাষ্য : আগরপাড়া এলাকার হাজেরা বেগম হোসনে আরার বরাত দিয়ে বলেন, ‘হোসনে আরা খুবই কষ্টে আছেন। আলুর মতো টিউমার তাঁর সারা শরীরে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, এমনকি বড়রাও তাঁকে দেখলে ভয় পায়। সারা রাত যন্ত্রণায় তিনি ঘুমাতে পারেন না; হাউমাউ করে কাঁদেন। ভয়ে তাঁর কাছেও যায় না কেউ। ’

মোশারফ মোল্লা বলেন, ‘(হোসনে আরা) একজন অসহায় মানুষ। কত টাকাপয়সা কত দিক দিয়ে খরচ করছে বিত্তশালীরা। কিন্তু এই অভাগিনীর খবর নেয় না কেউ। ’

রাসেল মাহমুদ নামে একজন বলেন, সমাজের মানুষ টাকা তুলে তাঁর চিকিৎসার খরচ করেছে কয়েকবার। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে কার সাধ্য আছে বারবার সহযোগিতা করার। সমাজের দানশীল ব্যক্তিরা যদি এগিয়ে আসেন, তাহলেই সম্ভব তাঁর ভালো চিকিৎসা।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান : স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান হোসনে আরা। সুস্থ হয়ে পরিশ্রম করে বাঁচতে চান। তিনি তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সমাজের দানশীল ও বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন।

সিভিল সার্জনের বক্তব্য : নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন আশুতোষ দাস কালের কণ্ঠকে জানান, রোগটির নাম নিউরো ফাইব্রো মেটোসিস। এটা স্নায়ুতন্ত্রের অসুখ। এ রোগের কারণ এখনো অজ্ঞাত। শরীরে আলুসদৃশ অংশগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, এগুলো এক ধরনের ইনোসেন্ট (নির্দোষ) টিউমার। এতে ব্যথা হলে ব্যথানাশক ট্যাবলেট দেওয়া হয়। হোসনে আরাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার পরামর্শ দেন সিভিল সার্জন।


মন্তব্য