kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কলাপাড়ায় অপচিকিৎসা

এক তেলে ১০ রোগের দাওয়াই!

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এক তেলে ১০ রোগের দাওয়াই!

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের ফুটপাতে বসে ‘মহাশঙ্কর তৈল’ দিয়ে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন কবিরাজ জাহাঙ্গীর হোসেন।

এক তেলে ১০টি রোগ নিরাময় হয়। মাথা ব্যথায় আগুনের সেঁক।

পায়ের নিচে শক্ত গোটা অপসারণে ছুরি দিয়ে কাটাকাটি। আসর জমিয়ে এ চিকিৎসা চালাচ্ছেন কবিরাজ। পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের সদর রোডে গত মঙ্গলবার এ দৃশ্য দেখা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাটের দিন হওয়ায় সড়কে ভিড়। রাস্তার পাশে মানুষের জটলা। একটি কার্টনে হলুদ চিনাকাগজে মোড়ানো কিছু বোতলের দিকে সবার নজর। এক যুবক হাঁকডাক দিয়ে উপস্থিত সবাইকে কৌশলে তার দিকে আকৃষ্ট করে। তেলের নাম ‘মহাশঙ্কর তৈল, হাত কাটা তৈল’।

মাঝবয়সী এক কৃষকের ডান পায়ের তলার দিকে শক্ত গোটা হয়েছে। ব্যথায় ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। কবিরাজ ঘোষণা দেন, ছুরি দিয়ে চামড়া কেটে তেল লাগালে সেরে যাবে। শুনে সবাই অবাক। কবিরাজ সেসব ভ্রুক্ষেপ না করে শক্ত চামড়া কাটার ফাঁকে সবাইকে অবহিত করতে থাকেন যে ‘এখন থেকে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে মহাশঙ্কর তৈলের মাধ্যমে এই ব্যক্তির পায়ের নিচের গোটা বের হয়ে আসবে। ’ চামড়া কাটার পর বিক্রেতা হাতে সামান্য তেল ও চুন মিশিয়ে মাটিতে বসিয়ে রাখা কৃষকের পায়ের নিচের কাটা স্থানে লাগিয়ে দেন।

আরেক ব্যক্তির কোমরে ব্যথা জানালে তাঁর ওপর চলে চিকিৎসা। উপজেলার চাকামইয়া গ্রামের পরিচয় দেওয়া মো. ইউনুচ গাজীর কোমর বাঁকিয়ে তেল মালিশ করা হয়। কবিরাজ সেখানে ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে ব্যথার পরিমাণ নির্ণয় করেন। এরপর তেলমাখা স্থানে একটি কাঠিতে লাগানো আগুন দিয়ে সেঁক দেওয়ার পাশাপাশি তেল মালিশ করা হয়। এই ফাঁকে বিক্রেতা উপস্থিত সাধারণ মানুষের কাছে কৌশলে বিক্রি করেন প্রতি বোতল ৫০ টাকা দরে ৮-১০টি বোতল তেল। এদিকে মাটিতে বসা কৃষকের পায়ের গোটা ১০ মিনিটেও বের হয়ে আসেনি। ছুরি দিয়ে খুঁচিয়েও সফল হননি বিক্রেতা।

এই আসরে উপস্থিত মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘সব ধাপ্পাবাজি। এরা গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মজমায় (জটলা) কোমরে ব্যথার অভিনয় করা লোকটি হচ্ছে ক্যানভাসারের নিজস্ব লোক। তার মাধ্যমে উপস্থিত সবাইকে আকৃষ্ট করে সুকৌশলে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর গোটা সারানোর জন্য বসে থাকা ব্যক্তি তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ি ফিরেছে। ’

কবিরাজ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ঢাকার আরিচার আবুল কাশেম মিয়ার কাছ থেকে তৈল কিনে আনি। কী দিয়ে তৈরি হচ্ছে তা বলতে পারব না। তবে খাঁটি সরিষার তেল ও বিভিন্ন বনজ গাছের রসকষ দিয়ে তৈরি করা হয়। আগুনের সেঁক দিয়ে তেলটি মালিশ করলে ব্যথাসহ অন্যান্য রোগ আরোগ্য হয়। এই তেল ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়। ’ তাঁর দেওয়া লিফলেটে উল্লেখ রয়েছে, ‘বাত, কানপাকা-পুঁজ পরা, আগুনে পোড়া, চর্ম রোগ, অর্শ্ব, শিরা রোগ, ক্ষত বা কেটে যাওয়া, ধ্বজভঙ্গ, পায়ের তলার গোটা ভালো করা যায় এই মহাশঙ্কর তেল দিয়ে। ’

পৌর বাসিন্দা ও কলাপাড়া উপজেলা সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সভাপতি মো. শামসুল আলম বলেন, গ্রামগঞ্জে, এমনকি উপজেলা শহরে দেদার চলছে ক্যানভাসারদের অপচিকিৎসা। ক্যানভাসারের বক্তব্য শুনলে মনে হয় তার এই ওষুধ বা তেল হচ্ছে সর্বরোগের পাথেয়। সম্প্রতি এ অপচিকিৎসার দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। উপশহর, জেলা বা বিভাগীয় শহরের চিকিৎসকদের অধিক ফি এবং রোগ নির্ণয়ের জন্য ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি অঘোষিত বাধ্যতামূলক হওয়ায় এমনটা ঘটছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ ও দিনমজুর পরিবারের সদস্যদের পক্ষে চিকিৎসকদের উচ্চ ফি দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না। তাই এই শ্রেণির মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাতের এ অপচিকিৎসার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. এম এম মান্নান বলেন, অপচিকিৎসা বন্ধে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় অভিযান চালাতে হবে। প্রয়োজনে প্রেশার গ্রুপ তৈরি করতে হবে। আর ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ীরা দালালের মাধ্যমে বাণিজ্য করায় রোগীর ফি বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারাও জড়িয়ে পড়েছেন।


মন্তব্য