kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পদ্মাপারে কান্না

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পদ্মাপারে কান্না

পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা পায়নি এ ভবনটিও। ছবিটি গতকাল দোহার থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাতাস ও তীব্র ঢেউয়ে আছড়ে পড়ছে পদ্মার পাড়। নিমিষে ভেঙে নদীতে পড়ছে বড় বড় মাটির চাপ।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ঢাকার দোহার উপজেলার মেঘুলা বাজারের চিত্র এটি। পাশে এক মধ্যবয়সী নারী বসে কাঁদছেন। তিনি বলেন, ‘এইব্যারও ভাঙতাছে, বাবা। দুইব্যার ঘর সরাইলাম। গেছেব্যার মনে করছিলাম, এই বছর বুঝি গাঙ্গে বান (বাঁধ) অইবো। এইব্যারও কিছু অইলো না। ’ তাঁর পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘যুদ্ধের পর থিকা হাসিনা মায়েরে ভোট দিয়া আইতাছি ভালবাইসা। জয়পাড়া মাঠে আইয়া কইলো গাঙ্গে বান দিয়া দিবো। কিন্তু পাশ কইর‌্যা খোঁজ  নিলো না আমাগো। ’

বর্ষার পর পানি কমতে শুরু করায় আগ্রাসী হয়ে উঠেছে পদ্মা। একটু বাতাস হলেই উত্তাল সমুদ্রের মতো ঢেউ আছড়ে পড়ছে পদ্মা নদীতে। ভাঙতে ভাঙতে পদ্মার পেটে চলে গেছে রানীপুর গ্রাম। ভাঙন চলছে মেঘুলা ও নারিশা পশ্চিমচরের বিস্তীর্ণ এলাকা। নদীপারের প্রতিটি পরিবার ভাঙনে নিঃস্ব।

অশ্রুতে ছলছল চোখ নিয়ে বয়োবৃদ্ধ আকবর মিয়া বলেন, ‘এত কষ্ট জীবনে আহে নাই। গতবার ভাঙলো, এইব্যারও ভাঙবো। কেউ কিছু করলো না। ’

অভাব যে কী জিনিস, তা জানতেন না মেঘুলা রানীপুর এলাকার আবুল সরদার। দ্বিতীয়বার ভাঙনে এখন তাঁর চোখে-মুখে হতাশা, ‘৫০০ টাকার লুঙ্গি পরতাম, এখন ১০০ টাকার লুঙ্গিও পাই না। ছেলের মনের ইচ্ছা পূরণ করতে পারি না। প্রাইভেটের টাকা দিতে পারি না। জন্মের পর এমন বিপদে পড়িনি কখনো। ’

পদ্মার পাড়ে দাঁড়ালে চোখ আটকে যায়। প্রায় তিন বছর আগেও রানীপুর গ্রামে পাঁচ হাজার পরিবারের বাস ছিল। এখন গ্রামটি একেবারে নেই। এখন ওই গ্রামের অনেকে নদীর দিকে আঙুল তুলে দেখাতে পারে ওইখানে ছিল অমুকের বাড়ি, তমুকের বাড়ি, জমি, আরো কত কী। ওসব এখন কেবল স্মৃতি। রানীপুর ভেঙে পদ্মা এখন মেঘুলা বাজারের দিকে ধেয়ে আসছে। মেঘুলায় এখন ভাঙন আতঙ্কে পড়ে আছে শূন্য ভিটা। ভিটার ওপর দুমড়েমুচড়ে পড়ে থাকা বসতবাড়ির কিছু সরঞ্জাম। ছাদের ঘরগুলো মিশে আছে ভিটার সঙ্গে। পাকা বাড়িগুলোর ইট, লোহালক্কড় বেরিয়ে আছে। কিছু নলকূপ চোখে পড়ল, ভাঙনের মুখে আছে।

ভাঙন এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো অশীতিপর সোলায়মান হকের সঙ্গে। প্রখর রোদের তাপে একটি গাছের নিচে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। জানালেন, এবারের ভাঙন দেখে মানুষ এ এলাকার আশপাশে নতুন করে ঘর তোলার সাহস পাচ্ছে না। এক সপ্তাহ আগে বাঁধা ঘর ভেঙে যাচ্ছে চোখের নিমিষে। তাই রাস্তার ওপর ঝুপড়িতে বাস করতে হচ্ছে।

রাস্তার ওপর কথা হলো নারিশা পশ্চিমচর গ্রামের আয়েশা আক্তারের সঙ্গে। গত তিন সপ্তাহ আগে ভাঙনে ভিটাবাড়ি হারিয়েছেন তাঁরা। ঘর তোলা হয়নি এখনো। খরপাতার একটি ছাদ কোনোমতে রাস্তায় রেখে এর নিচে চলছে বসবাস। আয়েশা বলেন, ‘কী করুম? বাঁধ না হইলে তো বুঝতে পারতাছি না গ্রামটা থাকব কি না। তাই কেউই ঘর তুলতাছে না। ’ ভাঙনের আগে আয়েশাদের সারি সারি ফলের গাছ ছিল। বিক্রি করতেন, নিজেরাও খেতেন। এখন তা নদীর পেটে। ছিল ব্যবসা, সেটাও নেই।

নদীর পাড় দিয়ে ঘুরছিলেন এক বিধবা। ঘরে দুই ছেলে, এক ছেলের বউ, পুতনি। খুঁটি (স্বামী) নেই। ভাঙনের শিকার হয়েছেন গত বছর। কবে ঘর তুলবেন জানতে চাইলে বলেন, ‘কই ঘর তুলুমু? ঘর কো? সব তো নদীতে নিয়া গিছে। ’

রাস্তা ধরে আরেকটু এগোতে কানে এলো কুড়ালের শব্দ। একটি ভিটায় মিস্ত্রি কালাম মিয়া খুঁটি কাটছিলেন। এটি সাহানাদের ঘর। স্বামী নেই। এক ছেলে ও তিন মেয়ে। আধাপাকা ঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন অন্যত্র।

পশ্চিমচর গ্রামের রাস্তার ওপর দেখা হলো আকলিমার সঙ্গে। এ গ্রামে ঘর ছিল তাঁদের। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভাঙনে নিঃস্ব হয়েছে পরিবারটি। ভিটা নেই। কিছু ফলের গাছ ছিল। তা বেচে কিছু টাকা আয় হতো। এখন কিছুই নেই। আকলিমা বলেন, ‘কিছু টাকা হইলেই আমগো একটা খরপাতার ঘর হইতো। ’

নারিশা পশ্চিমচর গ্রামটি এখন আর চেনা যায় না। ভাঙনে রূপ নিয়েছে ধ্বংসস্তূপে। নদীর পাশে একটি ভিটায় ঘর ভাঙার দৃশ্য চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে জানা গেল, গত বছর ভাঙনের শিকার পরিবারটি। ছিল আমবাগান, ফসলি জমি। এর কোনো চিহ্ন এখন নেই, সবই নদীর পেটে। পরিবারের সদস্যরা জানায়, ঘর তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্যের আশ্বাস পেলেও কোনো কার্যক্রম দেখতে পায়নি তারা। পশ্চিমচর গ্রামের কয়েক যুবকের সঙ্গে কথা হলো দীর্ঘক্ষণ। ওরা সঙ্গে ছিল সারাক্ষণ। ঘুরে দেখাল ভাঙন এলাকা। ভাঙনের আগে ও পরের চিত্র তুলে ধরে তারা বলে, অভাব যে কী, তা জানত না নারিশা পশ্চিমচর ও মেঘুলা এলাকার মানুষ। সারা দিন গ্রামের রাস্তা গমগম করত। এখন কিছুই নেই।

নিচু স্বরে রানীপুর গ্রামের জামাল বলেন, ‘শান্তি ছিল রানীপুর ও মধুরচর গ্রামে। ওই দুই গ্রামের এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে শাকসবজি, তরকারি, ফলফলাদি হতো না। বেশির ভাগ মানুষের ছিল ফসলি জমি। কত আনন্দ, কত ফুর্তি করেছি। এখন সব নদীতে। মন খারাপ হয়ে যায়। ’

পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন, ‘এক মাস আগে ড্রেজার দেখছিলাম নদীতে। দুই-চাইর দিন কী যে করল বুঝলাম না। নেতারা নদীতে আইসা ড্রেজারের মধ্যে ছবি তুইলা ফেসবুকে দিল। কিন্তু ভাঙন তো কমল না। সব কিছু আমাগো লগে ভাঁওতাবাজি। ’

এ বিষয়ে দোহার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, নয়াবাড়ী ইউনিয়নে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও নারিশা, মাহমুদপুর, সুতারপাড়া, বিলাসপুর ইউনিয়নে ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটারে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে যাবে। এর মধ্যে নয়াবাড়ীর জন্য ২১৭ কোটি টাকা ও অন্যান্য এলাকার জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা। এ প্রকল্প দুটি প্রক্রিয়াধীন। এ বছর বর্ষা মৌসুমে ১৬ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ আসে। এর মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার ড্রেজিং ও ১১ কোটি টাকার জিও ব্যাগ প্রকল্প। ড্রেজিং শুরু হলেও সাময়িকভাবে তা বন্ধ আছে। কয়েক দিন পর ফের শুরু হবে। আর জিও ব্যাগ ফেলার কাজ ১৫ দিনের মধ্যে শুরু হবে।

 


মন্তব্য