kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শেরপুর সীমান্ত

হাতি-মানুষ ‘যুদ্ধ’

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হাতি-মানুষ ‘যুদ্ধ’

শেরপুরের ঝিনাইগাতীর নকশি এলাকায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এভাবেই পাহাড়ের ঢালে আসে বন্য হাতির দল। ছবি : কালের কণ্ঠ

শেরপুর সীমান্তে বন্য হাতি ও মানুষের ‘যুদ্ধ’ যেন থামছেই না। পাহাড় থেকে খাবারের খোঁজে লোকালয়ে নেমে আসা হাতির দল ফসলের মাঠ-বাড়িঘরে তাণ্ডব চালাচ্ছে।

এমনকি পায়ে পিষ্ট করে, শুঁড় পেঁচিয়ে মানুষের জীবনহানি ঘটাচ্ছে। মানুষও জীবন রক্ষায় মারছে হাতি।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রের (আইইউসিএন) জরিপ অনুযায়ী, শেরপুরের বনাঞ্চলে বিচরণকারী ১২০-১২৫টি হাতি রয়েছে। এর সবই পরিযায়ী। এগুলোকে এশিয়ান হাতি বলা হয়। বর্তমানে এ প্রজাতি খুবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভারত থেকে আসা এসব হাতি শেরপুরের সীমান্তবর্তী আট হাজার ৩৭৬ একর বনভূমিতে বিচরণ করে।

ময়মনসিংহ বন বিভাগ ও শেরপুর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যালয়ের হিসাব মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে এ বছরের ২ অক্টোবর পর্যন্ত ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় হাতির আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের। আহত হয়েছে পাঁচ শতাধিক। অন্যদিকে মানুষের হাতে মারা পড়েছে ১৯টি হাতি। এর মধ্যে গত আড়াই বছরে (২০১৪ থেকে) প্রাণ গেছে ১৪ জনের। এ ছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ১২টি। বেশির ভাগই গুলিবিদ্ধ, ধারালো অস্ত্রের আঘাত কিংবা বিদ্যুতের পাতা ফাঁদে মারা পড়েছে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী সীমান্ত গ্রামে হাতির আক্রমণে এক নারীসহ তিন কৃষক নিহত হন। পক্ষান্তরে ১ অক্টোবর রাতে ঝিনাইগাতীর পানবরে এক বুনোহাতি মারা যায়।

ঝিনাইগাতীর ছোট গজনী, পশ্চিম বাঁকাকুড়া, পানবর, গান্ধিগাঁও, দুধনই, শ্রীবরদীর বালিঝুড়ি, হাড়িয়াকোনা গ্রামের জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, বুনোহাতির তাণ্ডব অব্যাহত থাকায় অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে।

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্রমাগত বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় হাতির খাবারের উৎস কমে গেছে। তা ছাড়া বনে মানুষের বাস ও আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় হাতির ‘হোমরেঞ্জ’ (নিজস্ব বিচরণক্ষেত্র) কমে গেছে। এ জন্য হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসছে।

বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী, হাতি হত্যা করলে দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। হাতির আক্রমণে নিহত হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন বিভাগ প্রতি পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহত হলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেবে। ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেন, ‘হাতি আমাদের জন্য এখন দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। আগে ধান ও কাঁঠালের মৌসুমে হাতি পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসত। এখন সারা বছর আসছে। এ কারণে এলাকার লোকজন রাতে ঘরবাড়িতে থাকতে পারছে না। ক্ষেতে ফসল ফলাতে পারছে না। ’

বাঁকাকুড়া গ্রামের দিলীপ চিরান বলেন, ‘প্রতিবছর হাতি তাড়াইতে গিয়া মানুষ মরে, হাতিও মারা পড়ে। হাতিই বা কী করব, তাগরেও তো খাওন লাগে। সরকারিভাবে পাহাড়ে হাতিগর খাওনের ব্যবস্থা অইলে তারা আমগর দিকে কম আইত। তাইলে সবারই উপকার অইত। ’

পানবার গ্রামের গৃহবধূ নূর জাহান বেগম বলেন, ‘ধান, কাডাল পাকলেই আত্তির (হাতির) পাল আমগর গেরামে নাইমা আয়ে। ঘরবাড়ি ভাইঙা ফালায়। পোলাপান নিয়া রাইত জাইগা বইসা থাহি। কী করমু, তহন তো কোনো উফায় থাহে না। এহেবারে যুদ্ধের নাহাল অবস্থা। আত্তির জীবনের দাম আছে, আমগর জীবনের দাম নাই?’

ছোট গজনী গ্রামের হাতি সুরক্ষা দলের সদস্য মফিজ উদ্দিন (৪৫) বলেন, ‘আগে মশাল জ্বালাইয়া, টর্চ মাইরা, জেনারেটরের আলো ফালাইলে, চিৎকার-চেঁচামেচি করলে হাতি চইল্লা যাইত। কিন্তু এহন তারা কিছুই মানতাছে না। অহন আলো দেকলে দৌড়াইয়া আলোর দিকেই আইয়ে। মশাল নিয়া দৌড়াইলে উল্টা  শুঁড় দিয়া আগুনের মশাল কাইড়া নিয়া তাড়া করে। এহন আমরা কি করমু কিছুই বুঝবার পাইতাছি না। ’

শ্রীবরদী উপজেলা ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে ভারতে স্থানীয় অধিবাসীরা রাবার-বাদামের বাগান করার জন্য হাতি তাড়াচ্ছে। আর চোরা শিকারিরা হাতির দাঁত ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের লোভে গুলি করছে। এতে বন্য হাতি উন্মত্ত হয়ে এপারে লোকালয়ে হানা দিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। এ হাতি-মানুষে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ’ তিনি এ জন্য ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতামূলক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালেদা নাছরিন বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় বন্য হাতির তাণ্ডবকে এখন দুর্যোগ হিসেবে দেখতে হবে। এ জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। ’

শেরপুর জেলা বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বন বিভাগ ২০১৫ সালে গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচা ও শ্রীবরদীর কর্ণঝুড়া এলাকায় ১০০ হেক্টর বনভূমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরি করেছে। এ ছাড়া হাতি যাতে লোকালয়ে না আসতে পারে এ জন্য তাওয়াকুচা, ছোট গজনী, বড় গজনী, হালচাটি ও মায়াঘাসি এলাকায় ১৩ কিলোমিটারে লেবু ও বেতকাটার বাগান করা হয়েছে। যাকে বলা হচ্ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল। এর সঙ্গে স্থাপন করা হচ্ছে সোলার প্যানেল শক। ’

শেরপুর বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতি খুবই উপকারী প্রাণী। তাই তাদের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সেই চেষ্টা করছে বন বিভাগ। ’ তিনি ভারতে গুলির বিষয়ে বলেন, ‘আমরা গত বছর আগস্টে কলকাতায় আন্তদেশীয় বৈঠক করেছি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত কথা হয়েছে। ওয়ার্কিং কমিটি করা হয়েছে। কিন্তু গুলির ঘটনা থামেনি। ’

শেরপুরের জেলা প্রশাসক ডা. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। উভয় দেশের সহযোগিতায় বন্য হাতির আবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সীমান্তে অভয়াশ্রম তৈরি করা হবে। এতে হাতি-মানুষে দ্বন্দ্ব কমে আসবে। ’

 


মন্তব্য