kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

শঙ্কা হলো সত্যি

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শঙ্কা হলো সত্যি

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পাড় দখল করে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল দোতলা এই বাড়ি। গত মঙ্গলবার বিকেলে বাড়িটি ধসে হ্রদে পড়ে যায়। এ ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। ইনসেটে ডুবুরিদল রাতেও উদ্ধার তৎপরতা চালায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর কাপ্তাই হ্রদের পাড় দখল করে অবৈধ স্থাপনা নিয়ে কালের কণ্ঠে ‘যেন বাপের তালুক’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় একটি বিশেষ প্রতিবেদন। ঠিক দুই বছর পর ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠেই ছাপা হয় আরেকটি প্রতিবেদন ‘বিবর্ণ কাপ্তাই হ্রদ’।

দুই বছরের ব্যবধানে ছাপা হওয়া দুটি প্রতিবেদনেই কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা বেদখল করে ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ বাস এবং নানা স্থাপনার কারণে হ্রদের সৌন্দর্য নষ্ট ও হ্রদের পানির মান কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।

অতঃপর অঘটন: অজানা শঙ্কার কথা বলা হয়েছিল কালের কণ্ঠের ওই দুই প্রতিবেদনেই। সর্বশেষ প্রতিবেদনটি ছাপা হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় সেই শঙ্কাই সত্য হলো! গত মঙ্গলবার বিকেলে রাঙামাটি শহরের সরকারি মহিলা কলেজ সড়কের পাশে হ্রদের অংশে তৈরি হওয়া একটি দ্বিতল ভবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই ধসে পড়ল। এতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ নারী, পুরুষ ও শিশু। পার্বত্য শহর রাঙামাটির ইতিহাসে ভবন ধসে পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম। ধসে পড়া ভবন থেকে পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। যাঁরা মারা যান তাঁরা হলেন ট্রাক ড্রাইভার জাহিদ, তাঁর মেয়ে পিংকি, জনৈক রফিকের দুই ছেলে সাজিদুল ও সামিদুল এবং রাঙামাটি সরকারি কলেজের অনার্সের ছাত্রী উম্মে হাবিবা রুনা।   ঘটনার পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে চারজনকে মৃত উদ্ধারের পর পরদিন বুধবার সকালে আরেকজনকে উদ্ধার করে অভিযান  শেষ করে নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা।

ভবন মালিকের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত কমিটি: ভবনধসের ঘটনায় রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোয়াজ্জেম হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন  দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন রাঙামাটি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুজ্জামান ও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুকোমল চাকমা।

এদিকে ধসেপড়া বাড়ির মালিক রেজাউল করিম, আবু তৈয়ব ও নঈমউদ্দিন টিটুকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন নিহত জাহিদের ভাই লিটন। ইমারত আইনের লঙ্ঘন, দণ্ডবিধি ৩০৪ ধারা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের ধারায় মামলাটি করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। জানা গেছে, বাড়িটির প্রকৃত মালিক প্রবাসী রেজাউল করিম হলেও এটির নির্মাণ ও দেখভাল করতেন তাঁর ভায়রা আবু তৈয়ব ও  শ্যালক নঈমউদ্দিন টিটু। বছর দুয়েক আগেও আবু তৈয়বের নির্মাণাধীন একটি ভবনের একাংশ ধসে পাশের বাড়ির একজন মারা যান। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিও এখনো চলছে। রাঙামাটির সহকারী পুলিশ সুপার চিত্তরঞ্জন পাল জানান, আসামিরা পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা: এদিকে ভবনধসের ঘটনায় নিহত পাঁচজনের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা ও ৩০ কেজি করে চাল সহায়তা দিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। বুধবার সকালে নিহতদের স্বজনদের হাতে এই সহায়তা তুলে দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান।

ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ: এদিকে হ্রদের পাড়ের ভবনধসে মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ রাঙামাটিবাসী। যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ, অনুমোদনহীন ভবন ও অবকাঠামো তৈরি এবং বিশেষত কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী নরম মাটির স্তর দখল করে ভবন নির্মাণকেই দুষছে এলাকাবাসী।

রাঙামাটির প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে যে কথা বলে আসছি, যে শঙ্কার কথা বলেছি, সেটাই তো সত্য হলো। এভাবে হ্রদের পাড়ে, জলাশয়ের ওপরে, যেখানে খুশি সেখানে অবৈধ দখল করে অনুমোদনহীন ভবন হলে তো এর  চেয়ে ভালো কিছু আপনি আশা করতে পারেন না। ’

উন্নয়নকর্মী ললিত সি চাকমা বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদ ঘেঁষে কী পরিমাণ জলাভূমি বেদখল হয়ে সেখানে বসতি গড়ে উঠছে, কারা বা কোন শ্রেণির মানুষ সেই বসতি গড়ে তুলছে কিংবা কারা বাস করছে, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাবে, প্রশাসনকে এ নিয়ে ভাবতে হবে। এতো বিশাল এলাকা বেদখল হয়ে গেলেও প্রশাসন নীরব কেন?’

টনক নড়েছে প্রশাসনের : এদিকে কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী স্থানগুলো দখল করে নির্মিত অবকাঠামোগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মানুষ নানা দাবি জানিয়ে এলেও বরাবরই নিশ্চুপ থাকত রাঙামাটির স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীলরা। কিন্তু মঙ্গলবারের ভয়াবহ ঘটনার পর সবাই নড়েচড়ে বসেছেন।

রাঙামাটির পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এটা আমাদের রাঙামাটিবাসীর জন্য খুবই কষ্টের যে নিরাপদ একটি শহরে এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটল। আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। রাতারাতি হয়তো সবকিছু করতে পারব না, তবে ধীরে ধীরে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়ে বিকল্প পুনর্বাসন করে সমস্যাটির সুরাহা করতে চাই। ’

রাঙামাটির নতুন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক। এ রকম ঘটনার যেন আর  পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য পদক্ষেপ নেব। ’


মন্তব্য