kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

কাঠগড়ায় কান্না

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কাঠগড়ায় কান্না

একটি মামলায় শুনানি চলছিল। কাজ শেষে হাকিম চেয়ার থেকে উঠবেন।

সেই মুহূর্তে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তিন আসামি কড়জোরে কিছু বলার অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে কারাগারের ভেতরে নির্যা তনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। এ ঘটনা ঘটেছে গত সোমবার দুপুরে শেরপুর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে।

প্রকাশ্য আদালতে এ ঘটনার সাক্ষী সিনিয়র সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) অ্যাডভোকেট মজদুল হক মিনু। তিনি জানান, শুনানি শেষে মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. সাইফুর রহমান এজলাস ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কাঠগড়ায় উপস্থিত আলাদা মামলার আসামি মিলন মিয়া (২২), নয়ন মিয়া (২৫) ও মোজাম্মেল হক রাজা (২৩) আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু বলতে চান। আদালত অনুমতি দিলে তাঁরা অভিযোগ করেন, কারাগারে তাঁদের নিয়মিত মাসোয়ারা দিতে হয়। মাসোয়ারা দিতে অস্বীকার করলে বা বিলম্ব হলে তাদের ওপর চলে অমানুষিক নির্যা তন। এ ছাড়া সেলে থাকা আসামিদের এককালীন তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকাসহ প্রতি মাসে এক হাজার করে টাকা দিতে হয়। এ সময় এক হাজতি বলেন, ‘আজ আমাদের মাসোয়ারা নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তা না হলে সন্ধ্যার পরই নির্যা তন চালানো হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ’

এ সময় সরকারি আইন কর্মকর্তা, আইনজীবী ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদিন আদালতে উপস্থিত জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার বলেন, ‘হাজতিরা অভিযোগ করে আদালতের কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙে পড়লে বিচারক বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। এরপর এজলাস ত্যাগ করেন। ’

এ ঘটনার পর আদালত অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গতকাল মঙ্গলবার জেলা কারাগার এলাকা ও আদালত অঙ্গনের বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কারাগারের ভেতরে নানা অনিয়ম চলে। এ অনিয়ম ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালালচক্র। দালাল ও কারাগারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বার্থ ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বের জের ধরে গত ২৯ সেপ্টেম্বর মারধর ঘটে।

পাল্টাপাল্টি মামলা : কারাগারের সামনে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রক্ষীদের মারধরের অভিযোগে আটজনের নামোল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে সদর থানায় একটি মামলা হয়। এ মামলার প্রধান আসামি পরিবহন শ্রমিক আলমগীর হোসেন ওরফে বিশু। তিনি কারাগার এলাকায় দালাল (আসামি ও কারারক্ষীদের মধ্যে অবৈধ লেনদেন করে থাকেন) হিসেবে পরিচিত।

এদিকে বিশুকে নির্যা তনের পাল্টা অভিযোগ তুলে জেল সুপার ও প্রধান কারারক্ষীসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আরেকটি মামলা হয়েছে। বিশুর স্ত্রী শান্তি বেগম মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে গত সোমবার মামলাটি করেন।

বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রদীপ দে কৃষ্ণ বলেন, ‘আদালত মামলাটি গ্রহণ করে বিশুর জখমের ডাক্তারি সনদপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে ঘটনার বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন। ’

শান্তির মামলায় অভিযোগ করা হয়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে জামিন পাওয়া আসামির স্বজনদের কাছ থেকে প্রধান কারারক্ষী বাবুল মিয়া প্রকাশ্যে নগদ টাকা হাতিয়ে নেন। এ সময় বিশুসহ কয়েকজন প্রতিবাদ করেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশুকে জেল সুপার কারাগারে ডেকে পাঠান। গেলে বাবুল, জাফর ও সেলিমসহ একদল রক্ষী বিশুর ওপর হামলা চালান। তারা তাঁকে পিটিয়ে আহত করেন। পরে  থানায় খবর দিয়ে বিশুকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। বিশুর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। ছয় দিন ধরে তিনি চিকিৎসাধীন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : শেরপুর সদর থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা কারাগারের তরফ থেকে দায়ের করা মামলাটি তদন্তাধীন। পক্ষান্তরে কারাগারের ঘটনায় আদালতে একটি মামলা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে কোনো কাগজপত্র হাতে পাইনি। আদালত থেকে নির্দেশনা পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

জেলা কারাগারের জেল সুপার মজিবুর রহমান বলেন, ‘পাঁচ রক্ষীকে মারধর ও ইটপাটকেল ছুড়ে কারাগার অফিসের জানালার কাচ ভাঙচুর করেছে। এ নিয়ে থানায় মামলা করা হয়েছে। এখন মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে আদালতে কাউন্টার মামলা করা হয়েছে। বিষয়টিকে বিতর্কিত করতে স্থানীয় এক আইনজীবীসহ কতিপয় লোক এসব করাচ্ছে। ’ কারাগারের ভেতরকার অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেছেন।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) ডা. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, ‘কারাগারে আমরা নিয়মিত যাই। বন্দিরা কখনো এমন অভিযোগ করেননি। আজও (বুধবার) যাচ্ছি। বন্দিদের অভিযোগ শুনব। এ অনুযায়ী পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

 


মন্তব্য