kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডলফিন মরছে ইলিশ জালে, পচছে সৈকতে

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ডলফিন মরছে ইলিশ জালে, পচছে সৈকতে

কুয়াকাটার গঙ্গামতিরচর সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতে মরা ডলফিন এভাবেই পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সাগরে ইলিশ জালে জড়িয়ে মারা যাওয়া ডলফিন ঢেউয়ের সঙ্গে সৈকতে এসে আটকা পড়ছে। শিয়াল-কুকুরও ওই অর্ধগলিত মরা ডলফিন মুখে নিচ্ছে না।

ফলে পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার গঙ্গামতি চরে। স্থানীয় প্রশাসন কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় সমুদ্র সৈকতেই পচে বালুর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মরা ডলফিনগুলো। ফলে পর্যটন এলাকার পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সমুদ্রের পানি দূষণ এবং বাতাসে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরেজমিনে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার জাতীয় উদ্যান গঙ্গামতি-সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতে গিয়ে দেখা গেছে, ১০-১২ দিন আগে একটি মরা ডলফিন সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে এসে আটকে আছে। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ভেসে আসা আরো একটি মরা ডলফিন পড়ে আছে আরো ২০০ গজ দূরে। উদ্যানের ঘন জঙ্গলে থাকা শিয়ালের অর্ধগলিত ডলফিন প্রিয় খাবার হলেও সৈকতে এখন মরা ইলিশের আগমন বেশি থাকায় তাতেই সন্তুষ্ট শিয়ালের দল। এখন মরা ডলফিনের কাছেও যাচ্ছে না শিয়াল। পচে-গলে যাওয়া ডলফিনের দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গঙ্গামতিতে ঘুরতে এসে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ পর্যটক জাহিদুজ্জামান বলেন, ‘কুয়াকাটা সৈকতের চেয়েও গঙ্গামতির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে শত গুণ বেশি টানে। তাই গতবারের অভিজ্ঞতার আলোকে আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি এখানে। কিন্তু এখানকার সৈকতের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা মরা ডলফিনের দুর্গন্ধে আমরা অতিষ্ঠ। তাই তাড়াতাড়ি গঙ্গামতির আকাশমনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বাগান এবং ঝাউবন দেখেই ফিরে এসেছি কুয়াকাটায়। ইচ্ছে থাকলেও ওখানকার সৈকতে গোসল করতে পারিনি। কুয়াকাটা সৈকত ম্যানেজমেন্ট কমিটির উদ্যোগে সৈকতটি পরিচ্ছন্ন রাখা হলে পর্যটকদের সুবিধা হতো। ’

স্থানীয় বাসিন্দা হাকিম ফকির জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর সাগরের জোয়ারের ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসে এই ডলফিন। তিন সপ্তাহ আগে আরো একটি মরা ডলফিন ভেসে আসে। এভাবে দুই-তিন দিন পর পর কিংবা প্রতি সপ্তাহে আসতেই থাকে মরা ডলফিন। গত এক মাসে গঙ্গামতি সৈকতে ১০-১৫টি মরা ডলফিন ভেসে এসেছে। এগুলো শিয়ালেও খায় না। এখন ইলিশ মৌসুম থাকায় শিয়াল সাগর থেকে ভেসে আসা মরা ইলিশ খেয়ে জীবন ধারণ করছে। তা না হলে শিয়ালের দল এই অর্ধগলিত ডলফিন মাছ খেয়ে সাবাড় করে ফেলত। তিনি আরো বলেন, মরা ডলফিন অপসারণের জন্য সরকারি, বেসরকারি কিংবা বন বিভাগের কেউই এগিয়ে আসছে না।

স্থানীয় জেলে জাহাঙ্গীর বলেন, ডলফিন সুচতুর এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন হওয়ায় ইলিশের জালে তেমন আটকা পড়ে না। কিন্তু কিছু ডলফিন জালে আটকা পড়া ইলিশ এবং ধাওয়া করা ইলিশ খেতে এসে জেলেদের জালে আটকা পড়ে। ডলফিন ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারায় জালে জড়িয়েই মারা পড়ে। ৮৫ হাত গভীর এবং চার হাজার হাত লম্বা ইলিশ শিকারের এই জালের নাম হচ্ছে ‘লাশ জাল’। মৌসুম হওয়ায় জেলেরা সমুদ্রের ইলিশ বিচরণ ক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থানে জাল ফেলে। আর ডলফিনও ওই ইলিশ খেতে গিয়ে জালে আটকা পড়ে।

এ ব্যাপারে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, কুয়াকাটা সমুদ্রে জেলেদের জালে জড়িয়ে মারা যাওয়া ডলফিন প্রজাতির নাম হচ্ছে ‘ইরাবতী’। পৃথিবীতে ৪৩ প্রজাতির ডলফিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৩৮ প্রজাতি সামুদ্রিক ও পাঁচটি মিঠা পানির। ইরাবতী প্রজাতির ডলফিন ৭০ থেকে ১৫০ সেকেন্ড পর পর বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয়। সাধারণত জেলেদের জালে ডলফিন জড়িয়ে পড়ার পর অক্সিজেন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অভাবে মারা যায়। জেলেরা ইচ্ছা করে ডলফিন মারে না। যেহেতু এ প্রজাতির ডলফিন শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য পানির ওপরে উঠে আসে, তাই প্রায়ই জেলেদের জালে আটকা পড়ে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মরা ডলফিন সৈকতে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাথুরে চুন এবং ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পলিথিনে করে মাটিতে পুঁতে রাখা উচিত। তা না হলে বাতাসের সঙ্গে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ছড়াতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে মরা ডলফিন সৈকতে আটকে থাকলে সেখানকার পরিবেশও দূষণ হতে পারে।

এ ব্যাপারে কুয়াকাটা সি বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য ও কুয়াকাটা পৌর চেয়ারম্যান আবদুল বারেক মোল্লা বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। সেখানে লোক পাঠিয়ে মরা ডলফিন মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য