kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সরকারি টাকায় এমপির শ্বশুরবাড়িতে সোলার

নড়াইল প্রতিনিধি   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি টাকায় এমপির শ্বশুরবাড়িতে সোলার

নড়াইল সদর উপজেলার চারিখাদা গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে বিদ্যুতের আলো জ্বলে। এর পরও গ্রামের ১৭টি বাড়িতে দেওয়া হয়েছে সোলার প্যানেল।

কারণ এই গ্রামে নড়াইল-২ (লোহাগড়া ও সদর আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) শেখ হাফিজুর রহমানের শ্বশুরবাড়ি। অথচ পাশের গ্রাম পার বলরামপুর বিদ্যুত্হীন হওয়ার পরও কেউ সোলার পায়নি। এমপি হাফিজুর জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং দলটির অঙ্গসংগঠন জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি।

সরকারি টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পে বরাদ্দ টাকায় ওই সোলার প্যানেল বিতরণ করা হয়েছে। এমপির স্ত্রীর ভাই (শ্যালক) আবু হাসান মোহাম্মদ এই কাজ করেছেন। ৮৫ ওয়াটের সোলার প্যানেলের প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে ৪০ ওয়াটের বাতি ও সরঞ্জাম।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, এমপির শ্বশুরবাড়িতে শ্যালক আবু হাসান মোহাম্মদ, চাচাশ্বশুর ইমদাদুল হক, টিপু সুলতান, চাচাতো শ্যালক শফিউদ্দিন মোল্লা, মিরাজ মোল্লা, মামাশ্বশুর সেকেন্দার মোল্লাসহ অন্তত ১৫ জন নিকটাত্মীয়র বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে সোলার প্যানেল। এমপির বরাদ্দ একটি প্রকল্পে ৩৬টি সোলার প্যানেলের মধ্যে শ্বশুরের ইউনিয়ন মাইজপাড়ায় দেওয়া হয়েছে ২৮টি। এর মধ্যে চারিখাদা গ্রামেই ১৭টি।

মাইজপাড়া ইউনিয়নের কাঠালবাড়িয়া গ্রামের মিলন মল্লিক এবং শলুয়া গ্রামের ফরিদুল হক জানান, বরাদ্দ ২৯ হাজার ২৩০ টাকার চেয়ে অর্ধেক দাম ও কম পাওয়ারের সোলার প্যানেল দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তাঁরা বাতি ও সরঞ্জাম নেননি।

চারিখাদা গ্রামের নুর মিয়া, দৌলতপুর গ্রামের আবুল কালাম এবং হোসেনপুর গ্রামের রেজাউল করিম জানান, তালিকায় নাম থাকার পরও রহস্যজনক কারণে তাঁরা সোলার পাননি।

শলুয়া গ্রামের ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ফরিদুল হক বলেন, ‘এমপির শ্যালক হাসান ছোট ছেলেদের নিয়ে কমিটি বানিয়ে কয়েকটি সোলার বিতরণ করেছেন, যার মূল্য সাত-আট হাজার টাকা হবে। ’

কাঠালবাড়িয়া গ্রামের মিলন মল্লিক বলেন, ‘এমপি বরাদ্দ দেন, তাঁর স্ত্রী নিলুফা ইয়াসমীন ও শ্যালক লিয়াজোঁ করে টাকা-পয়সা তুলে খায়। ’

মাইজপাড়া ভবেশচন্দ্র গণপাঠ নিকেতনের (পাঠাগার) সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গৌতম সাহা বলেন, ‘এমপির শ্যালক হাসান আমাদের পাঠাগারে ৮৫ ওয়াটের সোলার দেওয়ার কথা ছিল। ৬০ ওয়াট দিতে গিয়েছিল। দুইবার ফেরত দেওয়ার পর ৮০ ওয়াটের প্যানেল দিয়েছে। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নড়াইলের এক যুবলীগ নেতা বলেন, ‘কাবিটা প্রকল্পের একটি রাস্তার সংস্কারকাজের দুই লাখ ৬২ হাজার টাকার মধ্যে এমপির স্ত্রীকে আগাম ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ’

সোলার প্যানেল সরবরাহকারী ভেনাস পাওয়ার লিমিটেডের খুলনা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, ‘৪০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল ১৫ হাজার ৫০০, ৮০ ওয়াটের ২৫ হাজার ৫০০, ১০০ ওয়াটের ৩০ হাজার, ১৩০ ওয়াটের প্যানেল ৩৬ হাজার টাকায় সরবরাহ করা হয়। ’

এমপির শ্যালক আবু হাসান মোহাম্মদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি এ প্রতিবেদককে ‘আপনি কিছুই জানেন না’ বলে ভর্ত্সনা করেন। এরপর অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরলে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে সংযোগ কেটে দেন।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও এমপি অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘গরিব আত্মীয়স্বজন থাকলে তারা সরকারি সুবিধা পেতেই পারে। কম পাওয়ারের সোলার দেওয়ার কোনো সুযোগ নাই। ওটা সরকার নির্ধারিত কম্পানি এসে সরবরাহ করেছে। এটা আপনারা তদন্ত করে দেখেন। ভবিষ্যতে যে এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, সেখানে সোলারের প্রকল্প নেওয়া হবে। ’

এসব বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস বলেন, ‘এমপি যাদের মধ্যে সোলার বিতরণ করেছেন, তা সরকারের নীতিপরিপন্থী। তিনি শুধু দুটি এলাকায় প্রকল্প বরাদ্দ দিচ্ছেন। ’

নড়াইলের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, ‘এমপি তাঁর লোকজন দিয়ে প্রকল্প তৈরি করে থাকেন। এগুলো কখনো আমাদের কাছে আসে, আবার কখনো তাঁরা সরাসরি করে থাকেন। আমাদের হাতে এলে তা দেখে ফরোয়ার্ড করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। ’

 


মন্তব্য