kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাংবাদিক দীপংকর হত্যা মামলা

১২ বছরে তদন্তকর্তা পাল্টাল ১২ বার

লিমন বাসার, বগুড়া   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



১২ বছরে তদন্তকর্তা পাল্টাল ১২ বার

২০০৪ থেকে ২০১৬। মাঝে পেরিয়ে গেছে ১২ বছর।

দীর্ঘ এই সময়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো একটি ঘটনায় তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে ১২ বার। আদালত থেকেও বারবার পুনঃ তদন্তের নির্দেশ মিলছে। এর পরও খুনিরা অধরা। আর সর্বশেষ তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মজিবর রহমান গত দুই বছরে খুনের মামলার নথি তদন্ত করার সময় পাননি! এ কারণে নথিটি পড়ে রয়েছে ডিবি অফিসের অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে।

বগুড়ার প্রবীণ সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তী হত্যার ১২ বছর আজ। এই দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে চলেছে লুকোচুরি। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার পরও মামলার মোটিভ উন্মোচনে পুলিশ আগ্রহ দেখায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে তৃতীয়বারের মতো সিআইডি পুলিশ বগুড়ার চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর বাদীর নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক দফা শুনানির পর বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ২০১৪ সালে মামলাটি পুনঃ তদন্তের নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী ১২ নম্বর তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ডিবির এসআই মজিবর রহমান সেটি তদন্ত করছেন।

সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে ডিবি পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম জানান, এখনো এ মামলার কোনো কিনারা হয়নি। আসলে ক্লু পাওয়া না গেলে তদন্তে অগ্রগতি আনা অসম্ভব। এ জন্য সর্বশেষ তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও সংশয় থেকে যাচ্ছে। এসআই মজিবর রহমান জানান, অনেক মামলার চাপ। এই মামলা তদন্তে বিশেষ কোনো সময় দিতে পারছেন না তিনি। আর কোনো ক্লুও পাওয়া যাচ্ছে না।

কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর রাতে বাড়ির গেটের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রবীণ সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তীকে জবাই করে হত্যা করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরেই এই হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে চলছে লুকোচুরি। দফায় দফায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, ক্লুলেস মামলা হিসেবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং পরবর্তী সময়ে আদালত থেকে সেটা প্রত্যাহার করে আবারও একই থানা-পুলিশের কাছে তদন্তের জন্য পাঠানোর বিষয়টি আরো জটিল করে তুলেছে পরিস্থিতি। এই দীর্ঘ সময়ে ১২ জন পুলিশ কর্মকর্তার হাতবদল হয়েছে মামলাটি। এর পরও হত্যার মোটিভ ও হত্যাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি!

প্রয়াত দীপংকর চক্রবর্তীর বড় ছেলে পার্থ সারথী চক্রবর্তী বলেন, সিআইডির হাতে যখন মামলাটি ছিল তখন সিআইডির পাঁচ পাতার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারাংশ ছিল এমন—‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। দীপংকর চক্রবর্তী অজাতশত্রু, প্রচণ্ড ভালো এবং সৎ মানুষ। তাঁর শত্রু থাকা অস্বাভাবিক। তিনি খুন হয়েছেন সত্য। তাঁকে খুন করা হয়েছে সত্য। তাঁকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে খুন করা হয়েছে অনেকটা নিশ্চিত। কিন্তু এ খুনের কোনো কারণ নেই। এই খুনের কোনো আসামি নেই। সুতরাং মামলাটি ক্লুলেস হিসেবে বন্ধ করে দেওয়া হোক এবং মামলার আলামত ধ্বংস করা হোক। তবে কোনো দিন ক্লু পাওয়া গেলে আবারও তা সচল করা হবে। ’

কিন্তু লক্ষ করা যায়, যদি মামলাটি কোনো দিন চালু করাই হবে তবে সিআইডি আলামত ধ্বংসের সুপারিশ কেন করল? যে হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী একমাত্র আলামত, তা কেন ধ্বংস করা হবে? বাদীপক্ষের উকিলের এই জোরাল যুক্তিই আদালতে গৃহীত হয়। আদালত নির্দেশ দেন কোনো আলামত ধ্বংস করা যাবে না। এ ছাড়া দুইবার হুবহু চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইডি। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ প্রতিবেদনটি করা হয়। এ কারণে ২০১৪ সালে ফের মামলাটি পুনঃ তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রয়াত দীপংকরের ছোট ছেলে অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী বলেন, দেশে বড় বড় ঘটনার রহস্য গোয়েন্দা সংস্থা উন্মোচিত করেছে। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিককে জবাই করা হলো, আর সেই রহস্য ১২ বছরেও উন্মোচন করা যাবে না, এটি মেনে নেওয়া যায় না।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য শংকর বলেন, ‘পেশাদার একজন সাংবাদিক এভাবে খুন হবেন আর তাঁর খুনিরা শনাক্ত হবে না, খুনের বিচার হবে না, এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা সাংবাদিকরা যত দিন এই রহস্য উন্মোচন না হবে তত দিন বিচার চাইতেই থাকব। ’ তিনি বলেন, ১২ বছর পূর্তিতে আজ রবিবার বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের আয়োজনে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে।


মন্তব্য