kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অবৈধভাবে পানি তুলছে ভারত

ফেনী নদী থেকে পাইপ সরাতে বিএসএফকে বিজিবির চিঠি

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অবৈধভাবে পানি তুলছে ভারত

ফেনী নদীতে পাইপ বসিয়ে (লাল বৃত্ত) পানি উত্তোলন করছে ভারত। নদীর পাড়ে ঢেউটিন দিয়ে তৈরি পাম্প হাউস। ভারতের সাব্রুমের ছোটখীল সীমান্তের ছবিটি বুধবার চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা থেকে তোলা।ছবি : কালের কণ্ঠ

ফেনী নদী থেকে অবৈধভাবে পানি উত্তোলন করছে ভারত। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমের ১৭টি পয়েন্টে ২৬টি পাম্প বসিয়ে পানি উত্তোলন চালিয়ে আসছে দেশটি।

২০১২ সালের দিকে বাংলাদেশের তরফ থেকে পানি উত্তোলনের বিষয়ে বিরোধিতা করা হলে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে গোপনে আবার পানি উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে তারা। গত বুধবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রামগড় সীমান্তের ওপারে সাব্রুমে অনুষ্ঠিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যৌথ বৈঠকে নতুন করে ইস্যুটি সামনে আসে। ওই বৈঠকে নো ম্যান্স ল্যান্ডে ভারতের অবৈধভাবে বসানো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত্চালিত পাম্প মেশিন তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিএসএফকে চিঠি দিয়েছে বিজিবি।

ওই দিন ভারতের সাব্রুমে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বৈঠকে বিজিবির গুইমারা সেক্টরের ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল এম জাহিদুর রশীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রামগড় বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপঅধিনায়ক মেজর হুমায়ুন কবির, গুইমারা সেক্টরের জি টু মেজর রেজাউল হান্নান শাহীন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী ২ খ ম জুলফিকার তারেক। অনুষ্ঠানে বিএসএফের উদয়পুর সেক্টরের ডিআইজি ইয়াদ ভান্দ্রার নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন সাব্রুম বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার টি সিং নেগী ও সাব্রুম পানি উন্নয়ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠক থেকে ফিরে লে. কর্নেল এম জাহিদুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত ফেনী নদী থেকে ২৬টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প বসিয়ে দৈনিক ১০০ কিউসেকের বেশি পানি তুলে নিচ্ছে। দুই দেশের বৈঠকে আমরা পাম্পগুলো তুলে নিতে বিএসএফকে অনুরোধ করেছি। এ বিষয়ে একটি লিখিত চিঠিও দিয়েছি। ’

উল্লেখ্য, ১৯৮২ থেকে ২০০২ পর্যন্ত সময়ে ভারত ফেনী নদীর তীরে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প হাউস স্থাপন করে। ২০১২ সালের দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই পাম্প মেশিনের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে দৈনিক শতাধিক কিউসেক (১ কিউসেক সমান সেকেন্ডে ২৮ লিটার প্রবাহ) পানি তুলে নেয়। একতরফাভাবে পানি তুলে নেওয়ার কারণে নদীর ভাটি এলাকা মিরসরাইয়ের অলিনগর থেকে মুহুরী প্রকল্প পর্যন্ত বালুচরে পরিণত হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামগড়, উত্তর ফটিকছড়ি ও মিরসরাইয়ের অলিনগর সীমান্তের ওপারে ভারতের বসানো পাম্প হাউসগুলোর অবস্থান। নদীর উজানের জলপ্রবাহ থেকে ৩০-৫০ গজ দূরে ঢেউটিন দিয়ে স্থায়ী পাম্প হাউস নির্মাণ করেছে ভারত। ওই পাম্প হাউসে বৈদ্যুতিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটর বসিয়ে নদী থেকে পানি তুলে নিচ্ছে। স্থানীয় জনগণের নজরে না আসার জন্য অধিকাংশ পাম্প হাউস মাটির নিচে পাকা দেয়াল তৈরি করে স্থাপন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, এসব পাম্প হাউস থেকে পানি সরবরাহ করা হয় সাব্রুমের বিস্তীর্ণ এলাকায়। সেখানকার হাজার হাজার একর ফসলি জমি সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। ভরা বর্ষা ছাড়া বছরের বাকি ১০ মাস পানি উত্তোলন হয়।

মিরসরাইয়ের আমলীঘাট সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ২০১২ সালে নদী সুরক্ষার কথা বলে ব্লক বসিয়েছে ভারত। এই সীমান্তে পাম্প বসিয়ে ভারতের উপেন্দ্রনগরের জন্য পানি তুলে তা সরবরাহ করা হচ্ছে।

এদিকে বিজিবি রামগড় ক্যাম্পের কর্মকর্তারা জানান, ভারত চুক্তির মাধ্যমে আরো ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি তুলে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগে অবৈধভাবে বসানো পাম্প মেশিন তুলে নিতে হবে। তারপর ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে কোনো আপত্তি নেই।

এ বিষয়ে হালদা নদী বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘কোনো রকম চুক্তি ছাড়া ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক নদী আইনের পুরোপুরি লঙ্ঘন। উজানে থাকা দেশ এভাবে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ’

উল্লেখ্য, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ভারত এ নদীর উৎপত্তিস্থল তাদের দেশে বলে দাবি করছে। ভারতের তরফ থেকে দাবি করা হয়, এই নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যে। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গার ভগবানটিলায়। নদীর ১০৮ কিলোমিটারের কোনো অংশই ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি।

মিরসরাই উপজেলা পানি ব্যবস্থাপনা ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. জামসেদ আলম বলেন, ‘ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে। ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে ফেনী নদীর নাম নেই। ভারত সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এ নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করছে। এর ফলে মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। সেচ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শত শত কৃষক। ’

ফেনী নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক গোলাম নবী বলেন, ‘ফেনী নদীর পানি নিয়ে ভারত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। সরকারের তরফ থেকে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, ভারত শুধু ফেনী নদীর পানিই উত্তোলন করছে না কিছু কিছু সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের মানুষকে নদীর পানি ছুঁতেও দিচ্ছে না। ’

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের জেলা প্রধান ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) শামসুল আরেফীন বলেন, ‘আমি সদ্য যোগ দিয়েছি। সামনে নদী রক্ষা কমিশনের বৈঠক রয়েছে। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেব। ’

 


মন্তব্য