kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ

বাল্যবিয়ের দংশন!

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাল্যবিয়ের দংশন!

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের পারের চরের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার। বিয়ে কী, বোঝার বয়স হয়নি তার।

কিন্তু তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু জেসমিন নয়, দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের স্কুল-মাদ্রাসা পড়ুয়া আরো ২১ শিশুকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই মাসে। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরে ১০টি ও গত আগস্টে ১২টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিয়েগুলো দেওয়া হয়েছে ভুয়া জন্ম সনদে বা নিবন্ধন ছাড়াই। এ তথ্য পাওয়া গেছে ইউনিয়নটির বিভিন্ন গ্রামে অনুসন্ধান চালিয়ে।

মেয়ের বাল্যবিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জেসমিন আক্তারের বাবা দিনমজুর জেলাল উদ্দিন বলেন, ‘মাইয়া মানুষকে বেশি পড়ানো ঠিক না। ভালা সমন্ধ পাইছি, ছেলে ভালা, তার পরিবারও ভালা। এই জন্য বিয়া দিছি। ’ সরকারি নিয়ম অনুসারে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা এগুলান নাড়াচাড়া কইরা আমগর সম্পর্কটা নষ্ট কইরেন না। ’ একই ধরনের কথা জানান, হরিণধরা গ্রামের আবদুল আজিজ, কাউয়ার চরের জিয়াউর রহমান ও দাঁতভাঙ্গা গ্রামের ফকির উদ্দিন।

ঝগড়ার চরের দিনমজুর ছক্কু মিয়ার মেয়ে সুমি আক্তার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সুমিকে বিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে ছক্কু মিয়া বলেন, ‘কম ক্লাসে পড়লে কী অবো তার (সুমি) বয়স ১৪-১৫ অইছে। একবার স্কুলে গেছিল আবার মাদ্রাসায় ভর্তি অইছে। বড় অইয়া মাদ্রাসায় ভর্তি অইছে। তা ছাড়া ছেলে ভালা পাইছে, মানুষও ভালা। ’ তিনি বলেন, ‘আমগর মতো গরিব মানুষ অত আইনটাইন বুঝি না। জন্মনিবন্ধনে মাইয়ার বিয়ের বয়স অইছে, বিয়া দিছি। ’

দুর্গম দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা ধর্মপুর গ্রামের মজিবুর রহমানের মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আখরিনা খাতুনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে মজিবুর রহমান বলেন, ‘মাইয়াগরে বেশি বড় অইলে বিয়া দিতে এক গাদি ট্যাহা নাগবো। তহন ট্যাহা পামু কই। ছেলেপক্ষ কোনো যৌতুক ছাড়াই মাইয়াক টাইনা নিছে। ’

দাঁতভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বদিউজ্জামান জানান, ‘কাজিরা যতই বলুন বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি তাঁরা করেন না, এটা বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। কিছু টাকা বেশি দিলেই তাঁরা ওই কাজ করেন। এ ছাড়া চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও জন্মনিবন্ধনে মেয়ের বয়স বাড়ানোর পিছে ভূমিকা রাখেন। ’

দাঁতভাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানান, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে জন্মনিবন্ধন দেওয়া হয় তাতে মেয়ের বয়স বেশি দেখানো হয়। অনেক সময় জন্মনিবন্ধন জাল করে কাজিকে দেখানো হয়। এমনও ঘটেছে, কনের বয়স কম থাকায় কাজি বিয়ে রেজিস্ট্রি করেননি; কিন্তু পরে অভিভাবকরা রেজিস্ট্রি ছাড়াই বিয়ে দেন মেয়েকে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের কাজি মাওলানা সেকান্দার আলীর দুজন সাবকাজি হরিণধরা গ্রামের হাফিজুর রহমান ও দাঁতভাঙ্গা গ্রামের আবু বক্করকে ব্যবহার করছেন বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে। এ দুজন অর্থের বিনিময়ে জন্ম সনদ জালিয়াতি ও ভুয়া এফিডেভিটের মাধ্যমে বাল্যবিয়েগুলো করাচ্ছেন। জানতে চাইলে কাজি মাওলানা সেকান্দার আলী বলেন, ‘আমি বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করি না। তবে আমার এলাকায় প্রচুর বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটছে। বর ও কনের অভিভাবকরা কোর্ট থেকে এফিডেভিট করে আনছেন। তখন তো আমাকে রেজিস্ট্রি করতেই হয়। ’ এফিডেভিটগুলো ভুয়া, এমন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তা তো আমি বলতে পারব না। ’

দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম বাল্যবিয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি তো পরিষদ থেকে জন্ম সনদে বয়স বাড়িয়ে দিই না। কাজিরা কিভাবে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন তা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন তালুকদার বলেন, ‘দুই মাসে ২২টি বাল্যবিয়ের তথ্য আমার জানা নেই। তবে বাল্যবিয়ের খবর পেলেই আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এই তো কদিন আগে কালু শেখ নামের একজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিন দিনের সাজা দেওয়া হয়েছে। তিনি জালিয়াতি করে জন্ম সনদ আর কোর্টের এফিডেভিটপত্র তৈরি করে দিতেন। এমন অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ’


মন্তব্য