kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাক্ষীর অভাবে দুটি মামলার বিচার বন্ধ ১৬টির খবর নেই!

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সাক্ষীর অভাবে দুটি মামলার বিচার বন্ধ  ১৬টির খবর নেই!

কক্সবাজারে বৌদ্ধপল্লীতে ভয়াল সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার চার বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা একযোগে হামলা চালায় রামুর ঐতিহ্যবাহী ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধপাড়ায়।

পরের দিন উখিয়া ও টেকনাফেও হামলা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় আরো সাতটি বৌদ্ধ বিহার।

এসব ঘটনায় মোট ১৯টি মামলা হয়েছে। গত চার বছরে কেবল একটি মামলার আপস সূত্রে মীমাংসা হয়েছে। খালাস পেয়ে গেছে ৩৮ আসামি। বাকি কোনো মামলাই আর নিষ্পত্তি হয়নি।

গত বছরের শেষ দিকে দুটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও সাক্ষীর অভাবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির মুখে আদালত বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। চারটি মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য পাঠানো হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে।

কক্সবাজারের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মমতাজ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলাগুলোর বিচার নিয়ে আমি নিজেই হতাশ। আদালতে দুটি মামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের আদালতে তুলে আমি নিজেই নার্ভাস হয়ে পড়েছি। কেননা ভয়ে হোক বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণে হোক কোনো সাক্ষীই ঘটনায় আসামিদের দেখেছে—এ রকম সাক্ষ্য দিতে সম্মত নয়। ’

সরকারি এই কৌঁসুলি বলেন, তাই বাধ্য হয়েই ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ করে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালতে আবেদন জানানো হয়। এ পর্যায়ে চারটি মামলা পিবিআইতে অধিকতর তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। বাদবাকিগুলো আদালতের কার্যক্রমে রয়েছে।

মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এ কারণে এ সম্প্রদায়ের নেতারা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলোর বিচার দাবি করছেন; যাতে দ্রুত হামলায় জড়িতদের বিচার করা সম্ভব হয়।

রামু সীমা বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সম্পদ পুড়িয়ে যারা ধ্বংস করে দিয়েছে তাদের বিচার আদৌ পাব কি না তা নিয়ে শঙ্কিত। ’ এর কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই ভয়াল ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছিল। তদন্ত করে তারাই অভিযোগপত্র দিয়েছে। মামলা দায়ের করা থেকে শুরু করে তদন্ত ও অভিযোগপত্র দেওয়া পর্যন্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে পুলিশ তেমন যোগাযোগও করেনি বলে দাবি করেন তরুণ বড়ুয়া।

এই বৌদ্ধ নেতা আরো দাবি করেন যে ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এবং পরবর্তী সময় গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ঘটনার বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক।

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধপল্লীতে হামলার ঘটনায় কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার সদর থানায় ১৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭৭ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো ১৫ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পরবর্তী সময় তদন্তসাপেক্ষে সব মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

কক্সবাজার আদালত পুলিশের পরিদর্শক রণজিত কুমার পালিত জানান, মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে রামু থানার আটটি, উখিয়া থানার সাতটি, টেকনাফ থানার দুটি ও কক্সবাজার সদর থানার দুটি। এসব মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা হচ্ছে ৯৪৮। পরবর্তী সময় অধিকতর তদন্তে আরো ৩৬ জনকে নতুন করে আসামি করায় এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮৪।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক আরো জানান, ১৮টি মামলার মধ্যে ৯টি বিচারের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে নিম্ন আদালত থেকে। অন্য ৯টি মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুতের অপেক্ষায় রয়েছে নিম্ন আদালতে।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বরখাস্ত হওয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা তোফাইল আহমদ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অর্ধশতাধিক আসামি পলাতক এবং অন্যরা জামিনে রয়েছে।

রামু প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া বলেন, ‘আসলে আমরা এখনো নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করছি না। কারণ সেই ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের ভয়াল ঘটনায় জড়িতরা আমাদের সামনেই বুক ফুলিয়ে হাঁটছে। আমরা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাদের দ্রুত বিচার দাবি করছি। ’

নীতিশ বলেন, ঘটনার পরের বছর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি হামলায় ২০৫ জনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। এরপর চট্টগ্রামের দায়রা জজ আবদুল কুদ্দুস মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয় হাইকোর্টে। ওই প্রতিবেদনে ২৯৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এই দুটি প্রতিবেদনে যেসব হোতার নাম রয়েছে তারাও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কান্তি নাথ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে গ্রেপ্তারের পর আদালত থেকে তারা জামিনে বেরিয়ে আসছে। ’

চারটি মামলার অধিকতর তদন্তের বিষয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, তারা এ পর্যন্ত তিনটি মামলার নথি পেয়েছে। আরেকটি মামলা তদন্তের জন্য আদালতের আদেশ হলেও সেটার নথি তাদের কাছে এখনো পৌঁছেনি।

কক্সবাজারের পিবিআই পরিদর্শক জাবেদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে রামু থানায় দায়ের করা একটি মামলার অধিকতর তদন্তকাজ শেষ করেছি। ’ তিনি জানান, এই মামলার অভিযোগপত্রে থানা কর্তৃপক্ষ ঘটনায় জড়িত ৭০ জন আসামির নাম উল্লেখ করেছিল। পিবিআই অধিকতর তদন্ত করে আরো ২৬ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেয়েছে। এ কারণে ১০৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র তৈরি করে গত ২৩ জুলাই আদালতে পাঠানো হয়েছে।

দিন স্মরণে কর্মসূচি : রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলোতে হামলার এ ভয়াবহ দিনটি স্মরণে আজ বৃহস্পতিবার সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বুদ্ধপূজা, মহাসংঘদান, বিশেষ শান্তি শোভাযাত্রা ও স্মরণসভা। এ ছাড়া প্রায় সব বৌদ্ধ বিহারে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ প্রার্থনা।

উল্লেখ্য, ফেসবুকে কথিত একটি ছবি দেওয়ার জের ধরে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর মিছিল করে একদল লোক। পরে বৌদ্ধপল্লীতে হানা দিয়ে একে একে ৩২টি বসতঘর এবং ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও বিহার পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরের দিন উখিয়া ও টেকনাফে আরো সাতটি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি বসতঘর। রামু উপজেলা সদরের চেরাংঘাটা গ্রামের সুদত্ত বড়ুয়ার ছেলে উত্তম কুমার বড়ুয়ার (২৮) বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে এ তাণ্ডব চালানো হয়। এখন পর্যন্ত পুলিশ উত্তম বড়ুয়াকে আটক করতে পারেনি।


মন্তব্য