kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাঘবিধবা

শ্যামনগরে স্বামীহারা ১১৬০ নারী

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শ্যামনগরে স্বামীহারা ১১৬০ নারী

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় রয়েছে এক হাজার ১৬০ বাঘবিধবা। বাঘের হামলায় স্বামী মারা গেলে তাঁকে স্থানীয়ভাবে বলে বাঘবিধবা।

এই বিধবাদের সমাজে অপয়া (অশুভ) হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের দ্বিতীয় বিয়ে হয় না। সন্তান না থাকলে বাকি জীবন কাটে দুর্বিষহ।

স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে ২৮৫ জন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে ৮১ জন ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ১৪৩ জন বাঘবিধবা রয়েছেন। স্বাধীনতার পর থেকে তাঁরা বিভিন্ন সময় বিধবা হয়েছেন। তাঁদের স্বামীরা সুন্দরবনে মধু, গোলপাতা বা মাছ আহরণ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মরেছেন। আবার কুমিরের আক্রমণে মরেছেন অনেকে।

বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পানখালী জেলেপল্লীর সীতা রানীর (৫৫) দিন কাটে নদীতে কাঁকড়া ও রেণু ধরে। নদীতে না গেলে তাঁর পেটে খাবার পড়ে না। তাঁর স্বামী ও ছেলে দুজনই বাঘের হামলায় মারা গেছেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘আমারে বলিল জামাকাপড় পরিষ্কার কইরি রাখতি, বিকালে জঙ্গলে যাবে। আমি জামাকাপড় পরিষ্কার করে রাখলি দুপুরে গরম ভাত খেয়ে ও আর ওর বাপ বাদায় যায়। বিকালেই জাইলেরা এসে খবর দেয়, ওর বাপ বনে (বাঘে হত্যা করেছে) পইড়িছে। ছেলে ওর বাপকে নিয়ে রাতে বাড়ি আসে। বাপের শেষকৃত্য কইরি পরের দিনই দুমুঠো ভাতের জন্যি ছেইলি আবার বাদায় চলি যায়। ’

সীতা রানী জানান, পরে ছেলেকেও বাঘে হত্যা করে। ছেলের বউ আছেন। বনে গিয়ে যা পান, তাতে তাঁদের চলে না। তাই তাঁকে খাবারের জন্য যুদ্ধ করতে হয়। এর ওপর স্বামী হারানোর পর থেকে সইতে হচ্ছে নানা অপবাদ।

সীতা রানী আরো জানান, স্বামীকে বাঘে ধরলেই নানা রকম সামাজিক কুসংস্কার ঘিরে ধরে। শুনতে হয় অপয়া, অলক্ষ্মীসহ নানা অপবাদ। অনেককে ছাড়তে হয় স্বামীর ভিটা।

গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামের বকুল বেওয়া (৬০) জানান, ঠিক কত বছর আগে স্বামীকে বাঘে নিয়ে গেছে, তা মনে নেই তাঁর। তবে বছর ত্রিশেক আগে যে তিনি বিধবা হয়েছেন, তা মনে করতে পারেন। সেই সময়ই স্বামীর ভিটা ছাড়তে হয় তাঁকে। তারপর চকবারায় এসে বসবাস শুরু করেন সরকারি জায়গায়। তিনি নদীতে রেণু ও কাঁকড়া ধরতেন; কিন্তু এখন আর শরীরে শক্তি নেই তাই ভিক্ষা করে জীবন চলে তাঁর।

একই এলাকার পাচুর স্ত্রী তিন সন্তানের জননী কমলা জানান, দুই ছেলে ও এক মেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে সারা দিন নদীতে থাকতে হয় তাঁকে। এতে দুমুঠো ভাত জুটলেও আর কোনো কিছুই জোটে না তাদের।

উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘কুসংস্কারের কারণে বাঘবিধবারা সমাজে কোণঠাসা। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে সামাজিকভাবে প্রচারণা চালাতে হবে। ’

রজবাড়ী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ইলিয়াছ আল মেহেদী বলেন, ‘শিক্ষার অভাব থাকায় তাদের নিয়ে সমাজে কুসংস্কার রয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। ’

বিড়ালক্ষী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ বাবু জানান, গত চার-পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন করে এলাকার কেউ বাঘের আক্রমণে পড়েনি। তবে বাঘের থাবায় নিহতদের পরিবারগুলোর দিন চলে অতি কষ্টে।

শ্যামনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শেখ শহিদুর রহমান বলেন, ‘অসহায় বিধবাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বাঘবিধবাদের ভাতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। কুসংস্কার দূরীকরণেও বিভিন্ন সময় ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। ’

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, ‘আগে বাঘবিধবাদের পুনর্বাসনে কোনো কর্মসূচি ছিল না। তবে অতি সম্প্রতি তাদের তালিকা নিয়ে বয়স অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ’


মন্তব্য