kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চিকিৎসা ব্যবসার ফাঁদ

শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন বাতিল

শেরপুর প্রতিনিধি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চিকিৎসা ব্যবসার ফাঁদ

অনুমোদন বাতিল হওয়া বাজিতখিলা এলাকার শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ এ্যান্ড আলহাজ আবদুস ছাত্তার হাসপাতাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

টিনের দুটি চারচালা ঘর। দরজা-জানালাও ঠিকমতো নেই।

নেই কোনো ক্লাসের ব্যবস্থা। এর পরও সেটি মেডিক্যাল কলেজ। আউটডোর-ইনডোর চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা না থাকলেও সেই মেডিক্যাল কলেজ নামের সঙ্গে ‘হাসপাতাল’ সাইনবোর্ডও ঝুলানো হয়েছে।

এভাবেই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামে ‘শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড আলহাজ আব্দুস ছাত্তার হাসপাতাল’ নামের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল একটি চক্র। অবশেষে তথ্য গোপন, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির সব প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড। বোর্ডের রেজিস্ট্রার-কাম-সেক্রেটারি ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদনের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. এস এম রেজুয়ানুর রহমান (বকুল) স্বাক্ষরিত একটি আবেদন ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের রেজিস্ট্রার বরাবর দাখিল করা হয়। পরে প্রস্তাবিত কলেজটি সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য বোর্ড ওই বছরের ১১ মার্চ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। অন্যদিকে, শেরপুর জেলা সদরে ‘শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল’ চালুর অনুমতি চেয়ে ২০১৩ সালের ১২ মার্চ অধ্যক্ষ ডা. মো. আজিজুর রহমান বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের রেজিস্ট্রার বরাবরে একটি আবেদন করেন। উভয় কলেজ প্রস্তাবিত হলেও অনুমোদনের আগেই উদ্যোক্তারা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করেন।

এদিকে, প্রস্তাবিত ‘আলহাজ আব্দুস সাত্তার হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল’-এর জায়গা ও অবস্থানের ক্ষেত্রে তথ্য গোপন, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে মর্মে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. এস এম রেজুয়ানুর রহমানের বিরুদ্ধে ডা. মো. আজিজুর রহমান বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রার বরাবর দুটি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ করেন। এরপর সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে উভয় পক্ষের মধ্যে কতিপয় শর্তে ‘সমঝোতাপত্র’ স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতাপত্রে উল্লেখ করা হয়, কলেজ দুটি একত্রিত হয়ে ‘শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড আলহাজ আব্দুস ছাত্তার হাসপাতাল’ করা হবে এবং ডা. এস এম রেজুয়ানুর রহমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ডা. মো. আজিজুর রহমান ভারপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করবেন। পরে ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ওই নামে কলেজ ও হাসপাতালটি অনুমোদন পায়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতি ফাঁস হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিতর্কিত ব্যক্তি আলহাজ আব্দুস ছাত্তারের নামে হাসপাতালের নামকরণ করায় এলাকায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কলেজের নামে দান করা জমি বাজিতখিলা ইউনিয়নের সুলতানপুর মৌজার ১১০ নম্বর বিআরএস দাগে হলেও ঘর তোলা হয় প্রস্তাবিত জায়গা থেকে তিন হাজার ফুট দূরে ৯৯৪ নম্বর দাগে। কলেজের নামে এফডিআরের দুই লাখ টাকা সোনালী ব্যাংক, নয়ানি বাজার শাখা, শেরপুরে ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি জমা দেওয়া হলেও পরদিনই তা তুলে নেওয়া হয়। হোমিওপ্যাথিক কলেজের জন্য পৌর এলাকায় ১৫ শতক জমির প্রয়োজন। পৌর এলাকার বাইরে হলে প্রয়োজন ৩০ শতক জমি। কিন্তু পৌর এলাকার বাইরে সুলতানপুর মৌজায় কলেজের জন্য দান করা জমির পরিমাণ ১৫ শতক। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গত ৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বোর্ড অনুমোদন বাতিল করে।

এদিকে বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. এস এম রেজুয়ানুর রহমান (বকুল) গত ৩১ আগস্ট হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে তা খারিজ হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড গত ৪ সেপ্টেম্বর পরিপত্র জারি করে ওই প্রতিষ্ঠানের সব প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের ওই পরিপত্রের কপি দিয়ে জানানো হয়। শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ডা. এস এম রেজুয়ানুর রহমান (বকুল) বলেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। বাজিতখিলা এলাকায় কলেজটি প্রতিষ্ঠা করায় এমন ষড়যন্ত্র হয়েছে। ভাতশালা এলাকায় প্রতিপক্ষরা আরেকটি হোমিও কলেজ করার জন্য আমার কলেজটির অনুমোদন বাতিল করিয়েছে। ’

ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতি শিক্ষাবর্ষে জনপ্রতি তিন হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। শিক্ষার্থীরা জামালপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষা দিত। গত চার বছর ধরে এভাবেই চলছিল প্রতিষ্ঠানটি।


মন্তব্য