kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্ব নদী দিবস আজ

বিবর্ণ কাপ্তাই হ্রদ

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিবর্ণ কাপ্তাই হ্রদ

আয়তনে কিংবা সৌন্দর্যে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় জলাধার রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। ষাটের দশকে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে যে সুবিশাল জলাশয় তৈরি হয়েছে, কালের পরিক্রমায় সেটিই এখন কাপ্তাই হ্রদ।

প্রায় ৩৫৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ হ্রদের কাট্টলী বিল এলাকায় প্রশস্ততাও প্রায় ১০ কিলোমিটার! দেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙামাটিকে সাপের মতো ঘিরে রাখা এ হ্রদের তীরবর্তী জীবন, পাহাড় আর প্রকৃতি পার্বত্য শহর রাঙামাটিকে অরণ্যসুন্দরী নামেই বিখ্যাত করেছে সর্বত্র। হ্রদ-পাহাড়ের শহর রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের মন কাড়ে কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণে। কেবল ভ্রমণ কিংবা সৌন্দর্যই নয়, এ হ্রদের স্বচ্ছ পানি রাঙামাটির মানুষের খাবার ও ব্যবহার্য পানির প্রধানতম উৎস। ফলে এককালের প্রিয় কর্ণফুলী নদীর মতো কাপ্তাই হ্রদও রাঙামাটিবাসীর ভালোবাসার জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। জন্মের গল্প যতটা বেদনার আর হতাশারই হোক না কেন, এ হ্রদ এখন পার্বত্য জনপদের মানুষের জীবন আর জীবিকার অংশই বটে!

হ্রদের পাড়ে দখল উৎসব : পাহাড়ের মানুষের ভালোবাসার জমিনজুড়ে থাকা এ হ্রদ এখন ভালো নেই। দূষণ আর দখলে হ্রদটি তার চিরায়ত সৌন্দর্য ক্রমেই হারাতে বসেছে। দূর পাহাড়ের কিছু অংশ বাদে যেখানেই জনবসতি সেখানেই দখল হয়েছে হ্রদ। হ্রদের কোলজুড়ে সারি সারি বসতবাড়ি, দালানকোঠা। কখনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আবার কখনো লোভী মানুষের শিকার হয়ে এ হ্রদের পাড় জনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শহরের হাতে গোনা কয়েকটি এলাকা বাদ দিলে কাপ্তাই হ্রদের পাড় এখন দখলবাজদের কবজায়! অথচ শহরের তিন দিকেই বিস্তৃত অপরূপা কাপ্তাই হ্রদ। রাঙামাটি শহরে দখলবাজদের ছায়া সবচেয়ে বেশি পড়েছে রিজার্ভবাজার, বনরূপা, তবলছড়ি ও কলেজ গেট এলাকায়। দখলবাজিতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা চিরকালই ছিল। ফলে যখনই যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তাদের কর্মী বাহিনী ফ্রিস্টাইলে বাগিয়ে নিয়েছে হ্রদের তীর। গড়ে উঠেছে একের পর এক বসতবাড়ি আর স্থাপনা। তবে রাজনৈতিক কর্মীরা অত্যন্ত চতুর। দখলের পরই তা দ্রুত বিক্রি করে হাতবদল করে ফেলে তারা। ফলে শেষাবধি এই দখল করা স্থানে সাধারণ কোনো মানুষকেই দেখা যায় বসতঘর তৈরি করতে।

কমেছে পানির মান : শুধু দখলই নয়, কাপ্তাই হ্রদের পানিও ক্রমেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। হ্রদের পাড়ের বসতবাড়িসহ শহরের প্রায় সব ঘরবাড়ি, অফিস, স্থাপনার বর্জ্যের ও পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ লাইন গিয়ে পড়েছে কাপ্তাই হ্রদে। ফলে বদ্ধ পানির জলাশয়টি অপরিচ্ছন্ন আবর্জনা পড়ে এর পানি খাওয়া তো দূরের কথা, ব্যবহারেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একসময় এ অঞ্চলের মানুষ নির্দ্বিধায় পান করত হ্রদের পানি। কিন্তু এখন ছড়া, ঝরনা কিংবা গভীর নলকূপের পানিই খাবারের জন্য বিকল্প ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে এনজিও ফোরাম ফর ড্রিংকিং ওয়াটার অ্যান্ড সাপ্লাই এবং  জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বিভাগের এক পরীক্ষায় কাপ্তাই হ্রদের পানি খাবারের জন্য অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়েছিল।

রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সজল কান্তি দাশ জানান, কাপ্তাই হ্রদের পানির বর্তমান যে অবস্থা, তাতে এ পানি প্রক্রিয়াজাত ছাড়া কোনোভাবেই খাবার উপযুক্ত নয়। চারদিকে হ্রদবেষ্টিত হওয়ায় শহরের মানুষ সব ধরনের পয়োনিষ্কাশনের লাইন হ্রদেই দিয়েছে এবং সব বর্জ্যও হ্রদেই ফেলছে। আবার হ্রদে ইঞ্জিনচালিত নৌযানও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে হ্রদের পানি দিনে দিনে আরো বেশি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

ভালো নেই কাপ্তাই হ্রদ : শুধু দূষণ আর দখলই নয়, হ্রদ নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকা এবং হ্রদ ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে দেখছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের কর্মসূচি পরিচালক সৈয়দ হেফাজত উল বারি সবুজ বলেন, ‘এটা খুবই হতাশার, হ্রদের সামগ্রিক দেখভালের জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বশীল কেউ নেই। মত্স্যসম্পদ দেখে মত্স্য বিভাগ, বিদ্যুৎ নিয়ে ভাবে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, হ্রদের পানি ঘরে ঘরে সরবরাহ করে জনস্বাস্থ্য বিভাগ, হ্রদে বেড়াতে আসা পর্যটকের সঙ্গে ব্যবসাটা পর্যটন কর্তৃপক্ষের; কিন্তু  হ্রদের দখল বা দূষণ দেখার যেন কেউই নেই। এভাবে চললে তো দূষণ, দখল কিংবা সর্বনাশ সবই হবে। আর এটাও সত্য, আমরা মানুষ হিসেবেও সচেতন নই। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। ’

উপশহরের ভাবনা পৌর মেয়রের : এদিকে কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী স্থানগুলো বেদখল হওয়ায় চিন্তিত পৌর কর্তৃপক্ষ। আবার দখলকারী মানুষদের বিকল্প স্থানে পুনর্বাসনের বিষয়টিও ভাবনায় আছে তাদের। এমন তথ্য জানিয়ে রাঙামাটির পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এটা খুবই হতাশার যে রাঙামাটিতে আসা পর্যটকরা হ্রদের পাড়ের অবৈধ স্থাপনা দেখে হতাশ হচ্ছে। এসব স্থাপনা শহরের সৌন্দর্যকে নষ্ট করছে, রাঙামাটির নেতিবাচক ভাবমূর্তি দাঁড় করাচ্ছে। তাই আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছি। একটা সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা করছি। এ পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের শহরের একটি রূপরেখাও দাঁড়াবে এবং একই সঙ্গে হ্রদের পাড়ের সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নিয়ে একটি নতুন উপশহর করার ভাবনাও থাকছে আমাদের পরিকল্পনায়। ’


মন্তব্য