kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বকের গ্রাম কদমতলা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বকের গ্রাম কদমতলা

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কদমতলা বকের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাইবান্ধা শহর থেকে সদরের লক্ষ্মীপুর নলডাঙ্গা হয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন পেরিয়ে মোটরসাইকেলে ১৫ মিনিটের পথ পেরোলে কদমতলা গ্রাম। অন্য সব পাখপাখালি থাকলেও এলাকাটি এখন পরিচিত বকের গ্রাম হিসেবে।

বকের লম্বা লম্বা পা ফেলে দলবেঁধে ছুটে চলা, তাদের খাবারের সন্ধান, একসঙ্গে উড়ে বেড়ানো, আর সন্ধ্যা নামলে বাসায় ফেরার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বকের এ মিছিল প্রকৃতিকে দিয়েছে ভিন্ন এক সৌন্দর্য। এ এলাকায় সাদা বক তথা পাখিদের পদচারণ যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের গৃহবধূ শ্যামলী রানী কোনো তন্ত্রমন্ত্র জানেন না। ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে তিনি বকগুলোকে আপন করে নিয়েছেন। খাবার হাতে ডাকতেই বাঁশঝাড় থেকে উড়ে আসে বক। তাঁর হাত থেকে খাবার খেয়ে আবার উড়াল দিয়ে গিয়ে বসে বাঁশঝাড়ের মাথায়।

এ ব্যাপারে প্রতিবেশী আবদুর রহমান বলেন, ‘অ্যাংকা দৃশ্য আগে দেকি নাই বাহে। হামার মন একেবারে জুড়ি গেল। মনে হয় মায়ের কোলত ছোল নামি আইলো বাবা!’

বকের গ্রাম কদমতলায় অন্যান্য জাতের পাখির সংখ্যাও কম নয়। এ যেন পাখিদের অভয়ারণ্য। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে এখানকার মানুষের। স্থানীয় ভাষায় সাদা বক, জ্যাটা বক, আম বক, কানি বক, বিলুপ্ত প্রায় কালো পানকৌড়ি, রাতচোরাসহ অন্য পাখিদের দখলে এ এলাকা। স্থানীয় লোকজনের বুনো পাখিদের জন্য মমত্ববোধের কারণে গত এক বছরে কদমতলা পাখপাখালির আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

গ্রামের শিক্ষক শশীমোহন বর্মণ জানান, দূর থেকে গ্রামটিকে নিয়ে ছড়া কাটে লোকজন—‘ওই দেখা যায় তালগাছ/ওইখানেতে বাস করে কানা বগির ছা। ’ বকের সঙ্গে এখানকার গ্রামবাসীর গভীর সখ্য গড়ে উঠেছে। এখানে পাখির ডাকে সকালে সবার ঘুম ভাঙে। বাইরে থেকে চুরি করে অনেকে বক শিকারে আসে। কিন্তু এলাকাবাসী সজাগ থেকে তাদের প্রতিরোধ করেছে।

গ্রাম ঘুরতে আসা সংবাদকর্মী ভবতোষ রায় বলেন, ‘কদমতলা গ্রামে সারা দিন থেকে দেখেছি, কিভাবে পাখিরা আহারের সন্ধান করে। সন্ধ্যা নামার আগেই আবার দল বেঁধে বাসায় ফেরে। এ সময় চারপাশে শুধু পাখিদের কোলাহল ও কিচিরমিচির শব্দ। এরা বাঁশ বা বিভিন্ন গাছের মগডালে বসে কখনো ডানা ঝাপটায়, আবার গাছের ওপর দিয়ে দুই-এক চক্কর দিয়ে ফিরে আসে। সন্ধ্যা যত ঘনিয়ে আসে, তখন বিভিন্ন গাছের সবুজ পাতাগুলো সাদা বকের রঙে সাদা ফুলের মতো দেখায়। তখন এক দারুণ দৃশ্য তৈরি হয়। ’

গ্রামের ক্ষীতিশ চন্দ্র বর্মণ জানান, স্থানীয় লোকজনের ভালোবাসায় সেখানে বাসা বেঁধেছে ঝাঁকে ঝাঁকে বক। আর চোরা শিকারিদের হাত থেকে এলাকাটি নিরাপদ হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকেও বকসহ অন্য পাখিরা এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। চলছে প্রজনন আর বংশ বিস্তারও।

এলাকাবাসী জানায়, কদমতলা গ্রামের খামারি শচীন্দ্রনাথ বর্মণ প্রথমে তাঁর বাড়ির পাশাপাশি বাঁশঝাড় ও গাছপালায় বক ও অন্যান্য পাখির নির্বিঘ্নে বসবাসের সুযোগ করে দেন। পরে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এরা বাসা বেঁধে বংশ বিস্তার শুরু করে। তিনি বলেন, নানা জাতের বকের কারণে এলাকাটিকে অনেকে বকের গ্রাম বলে চেনে।

গাইবান্ধা সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক খলিলুর রহমান জানান, কদমতলায় প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় নিবেদিত পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে গ্রামবাসীর মমতা আর ভালোবাসা। প্রকৃতিতেও ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করছে এ পাখি। এ জাতীয় উদ্যোগের তুলনা হয় না।


মন্তব্য