kalerkantho


হিলিপের গ্রাম রক্ষা দেয়ালে ধস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হিলিপের গ্রাম রক্ষা দেয়ালে ধস

সামনে বিস্তীর্ণ হাওর, পেছনে নদী। হাওর ও নদীর মাঝে দ্বীপের মতো ভাসছে শিমুলবাগ গ্রাম।

ভাঙনের কবলে পড়ে একসময়ের বিশাল জনপদ আজ একচিলতে ছোট্ট গাঁ। গত ৪০ বছরে ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, কেবল তারাই রয়ে গেছে।

এ গ্রামটিই রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয় গত বছর। গ্রামের চারপাশে বসানো হয় প্রতিরক্ষা দেয়াল। কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে এক বছরের মাথায় ধসে গেছে তা। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ওই গ্রামের লোকজন আবারও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ ও মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে। সামনের দেয়াল ধসে পড়ায় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও পড়েছে হুমকির মুখে।

গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সাফিয়া আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবার দাবি ছিল, গ্রাম বাঁচাতে দেওয়া হোক একটি প্রতিরক্ষা দেয়াল।

সেই দেয়াল হলো ঠিকই, কিন্তু তা কাজে লাগছে না। বছর না ঘুরতেই ধসে যাচ্ছে। ’

গ্রামবাসী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই ওয়ালে গেরামের চাইরানার কামও অইছে না। এই বছরের ওয়াল এই বছরেই ভাইংগিয়া গ্যাছে। নতুন কইরা গ্রামও ভাঙতাছে। সরহারি টেহা সবটাই জলে গেছে। ’

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, হাওর অঞ্চলের অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের (হিলিপ) আওতায় গত বছর ৬৫ লাখ টাকা খরচ করে গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা হয়। এটি লম্বায় ছিল ৭০৫ মিটার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।

গ্রামের লোকজন মনে করছে, এভাবে ঢালাই করা পাটাতন দিয়ে ভাঙনের কবল থেকে গ্রাম বাঁচানো যাবে না। দরকার আরসিসি দেয়াল (পিলারসহ ইট-সিমেন্টের গাঁথুনি)। তাদের অভিযোগ, যদি দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজ না হতো তাহলে দেয়ালটি আরো মজবুত হতো, হয়তো টিকতও বহু দিন।

ধসে পড়া প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিমুলবাগ গ্রামের জসিম দাদ খান। তিনি বলেন, ‘গ্রামে প্রতিরক্ষা দেয়াল হচ্ছে, এ কথা শুনে সবাই তাদের বাড়িঘর মেরামতের উদ্যোগ নেয়। ধারকর্জ করে, গরু বেচে, জমি বেচে দেয়ালের কাছাকাছি জায়গায় মাটি ফেলে তাদের বাড়িঘর সরিয়ে নেয়। কারণ গ্রামের পেছনে ধনু নদীর ভাঙন দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু লাখ লাখ টাকা খরচ করেও শান্তি আসেনি। অসংখ্য জায়গায় দেয়াল ধসে পড়ায় দুর্ভাবনায় আছি। ’

হিলিপ প্রকল্পের কিশোরগঞ্জ জেলা সমন্বয়কারী মো. নূরুল আমিন অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা দেয়ালটি গ্রাম ঘেঁষে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু স্থানীয়দের অনুরোধে গ্রামের জায়গা বাড়ানোর স্বার্থে দেয়ালটি অনেকটা হাওরের দিকে সরিয়ে আনা হয়। এখানে দেয়ালের ভেতরে অর্থাৎ গ্রামের দিকে খালি জায়গায় প্রচুর মাটির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই পরিমাণ মাটির ব্যবস্থা স্থানীয়রা করতে পারেনি। ফলে হাওরের পানির চাপে দেয়ালটি ধসে গেছে। ’

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দানেশ আকন্দ হিলিপ কর্মকর্তার দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে প্রকল্পের কাজ দায়সারাভাবে শেষ করা হয়েছে। লাখ লাখ টাকার মাটি ফেলেও যদি না হয়ে থাকে, তাহলে বলব আমাদের আর ক্ষমতা নাই। গরিবের ঘোড়া রোগের প্রকল্প তাহলে এখানে কেন নিয়ে আসা হলো? আমাদের সামর্থ্যের বিষয়টিও তো প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। ’

জমিলা আক্তার নামের এক নারী এ প্রতিবেদককে সামনে পেয়ে বললেন, ‘আমরা এইতা বুজি না, আমরার গেরাম ঠিক কইরা দেইন। এমুনবায় কইরা দেইন, যাতে আর না বাঙ্গে। অহন যদি আরেকবার গেরাম বাঙ্গে, আমরার আর যাওনের জায়গা নাই। ’

কিশোরগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মওলা বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে এ প্রকল্পের বাজেট ছিল কম। তবে ধসে যাওয়া অংশগুলো মেরামতযোগ্য। পানি কমে গেলে এগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে। আর দেয়ালের ভেতর দিক দিয়ে আরো মাটি ফেলতে হবে। মাটি ফেলা বাবদ কোনো বরাদ্দ প্রকল্পে ছিল না। আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এ দেয়াল টেকানো যাবে না। ’


মন্তব্য