kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কুষ্টিয়া

চ্যাম্পিয়ন হাসপাতালের এখন ‘সংকট রোগ’

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চ্যাম্পিয়ন হাসপাতালের এখন ‘সংকট রোগ’

এটাই কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল। চিকিৎসাসেবার জন্য বছরখানেক আগে হাসপাতালটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বিভাগ পর্যায়ে। আর এখন প্রতিষ্ঠানটির এ রকমই হাল। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল। বছরখানেক আগেও চিকিৎসাসেবায় ছিল খুলনা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন, সারা দেশের হাসপাতালগুলোর মধ্যে হয়েছিল রানার আপ।

আর এখন চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে রোগীদের অভিযোগের অন্ত নেই। নানা সংকটে পড়ে ২৫০ শয্যার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম এখন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বারবার জানিয়েও কোনো ফল মিলছে না। এ কারণে কুষ্টিয়াবাসীর পাশাপাশি ভোগান্তি পোহাচ্ছে চিকিৎসা সেবাপ্রত্যাশী পাশের চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও রাজবাড়ীর মানুষ। বর্তমানে ওই হাসপাতালে ৫৮টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন মাত্র ৩৩ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৬৩ সালে স্থাপিত এ হাসপাতালের শুরুতে শয্যা সংখ্যা ছিল ১৫০। ২০০৫ সালে উদ্বোধন হলেও ২০১০ সালে হাসপাতালটিতে ২৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১১ সালে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ চালুর দুই বছর পর ২০১৪ সালে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালকে অস্থায়ী ভিত্তিতে মেডিক্যাল কলেজ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে এখন শুধু কুষ্টিয়া নয়, আশপাশের জেলা ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও রাজবাড়ীর মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু সে অনুসারে বাড়েনি লোকবল, বাজেট আর সেবার মান।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, জরুরি বিভাগের চারটি পদ থাকলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে মাত্র একজনকে দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। সার্জিক্যাল বিভাগে কনসালট্যান্ট চিকিৎসকের তিনটি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন। হাসপাতালের একমাত্র মেডিসিন কনসালট্যান্ট সালেক মাসুদ এক বছর আগে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজে বদলি হন। এরপর এখন পর্যন্ত ওই পদে কোনো কনসালট্যান্টকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। প্রায় দেড় বছর আগে গাইনি কনসালট্যান্ট রুমী ফরহাদ আরা কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজে বদলি হলেও ওই পদ এখনো শূন্য। দুই বছর ধরে অ্যানেসথেসিয়া কনসালট্যান্ট নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, শুধু কুষ্টিয়া জেলার রোগী হলেও সেবার মান আরেকটু বাড়ানো যেত। কিন্তু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘোষণা দেওয়ায় অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় এখানে আসছে। এদের বেশির ভাগের চিকিৎসা নিজ নিজ জেলা হাসপাতালেই করা সম্ভব হলেও ওই সব হাসপাতালের চিকিৎসকরা দায়িত্ব এড়াতে রোগীদের এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাতে দিন দিন সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের কয়েকটি ফ্লোরে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। গন্ধে রোগীরা নাক বন্ধ করে হাঁটছে। পরিষ্কার করার লোক নেই। এ ছাড়া টয়লেট থেকে ময়লা পানি বের হয়ে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব বিষয় দেখারও কেউ নেই।

বটতৈল এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মোতালেব জানান, রক্ত পরীক্ষা দিলেও হাসপাতাল থেকে করাতে পারেননি। পরে হাসপাতালের সামনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে বাধ্য হয়েছেন। এক দালালের মাধ্যমে তিনি সেখানে যান। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, ডা. আজিজুন্নাহার এখানে যোগ দেওয়ার পর সেবা খাতে পরিবর্তন আসে। রোগীদের সেবার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন তিনি। কিন্তু তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. তাপস কুমার সরকার জানান, জনবল কাঠামো অনুযায়ী হাসপাতালে সব মিলিয়ে ৫৮ জন চিকিৎসক থাকার কথা। সেখানে আছেন মাত্র ৩৩ জন। এ ছাড়া সেবিকা ও বিভিন্ন বিভাগের টেকনোলজিস্টসহ অন্য ৭১টি পদেও লোকবল নেই। হাসপাতাল ২৫০ শয্যার হলেও এখানে প্রতিনিয়ত পাঁচ শ থেকে সাড়ে পাঁচ শ রোগী ভর্তি থাকে। এ ছাড়া প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা প্রায় দেড় হাজার রোগীর সেবা দিতে অন্তত ১৫ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন হলেও তা সামলাতে হচ্ছে পাঁচজন চিকিৎসককে দিয়ে। ডা. তাপস আরো জানান, হাসপাতালে মাত্র তিনটি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। রোগীর যা চাপ তাতে আরো তিনটি অপারেশন থিয়েটার দরকার। এ ছাড়া শল্য চিকিৎসার রোগীদের ক্ষেত্রে ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। সিরিয়ালের জটিলতায় দিনের পর দিন ধরে ঘুরতে থাকার অভিযোগও রয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দিনভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আবদুল মান্নান বলেন, ‘নানা সংকটের মধ্যেও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে। চিকিৎসক সংকট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের সেবা পেতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে জানানো হয়েছে। ’


মন্তব্য