kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বরগুনার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর

দুর্নীতির ‘গুরু’ রাজ্জাক

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দুর্নীতির ‘গুরু’ রাজ্জাক

প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক

আবদুর রাজ্জাক। বরগুনা সদর উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপসহকারী প্রকৌশলী।

গত পাঁচ বছরে তাঁর অধীনে যত উন্নয়নকাজ হয়েছে, দুর্নীতির কারণে তা ম্লান হয়েছে। উল্টো জনসাধারণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি ৩) অধীনে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র-কাম বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান ও যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা। কৌশলে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক কোটি টাকারও বেশি ঘুষ হাতিয়ে নেন। পূর্ব ধুপতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণকাজের দরপত্রের নিয়ম পরিবর্তন করেন। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ পাইয়ে দেন। এ বিষয়ে বঞ্চিত ঠিকাদার কেপি ট্রেডার্সের মালিক নাসরিন সুলতানা পলি বলেন, ‘জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করতে চাইনি বলে সেদিন এ অনিয়মের বিষয়টি হজম করে নিয়েছি। সরকারের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ভেস্তে যাচ্ছে এসব অসাধু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে। ’

স্থানীয় সূত্র আরো জানায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইমার্জেন্সি ২০০৭ সাইক্লোন রিকভারি অ্যান্ড রিস্টোরেশন প্রকল্পের (ইসিআরআরপি) আওতায় বাঁশবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। আবদুর রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্পে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। কাজ শেষ হয় ২০১৫ সালে।

বাঁশবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামিমা সুলতানা মালা বলেন, ‘সদ্য নির্মিত এ ভবনটিতে এমন কোনো কক্ষ নেই, যে কক্ষ থেকে ছাদ চুইয়ে পানি না পড়ে। প্রবল বর্ষণের সময় এত পানি পড়ে যে সে পানি সেচতে ভিন্ন লোক নিয়োগ করতে হয়। সামান্য বৃষ্টিতে যে ভবনের ছাদ চুইয়ে অঝোরে পানি পড়ে, ঘূর্ণিঝড়ের সময় সে ভবনে মানুষ আশ্রয় নেবে কোন সাহসে?’

বাঁশবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা ঠিকাদার সমিতির সভাপতি মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাব ছিল। ’

স্থানীয় সূত্রে আরো জানা গেছে, ইসিআরআরপির অধীনে সদর উপজেলার লাঙ্গলকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রায়েরতবক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এ কাজের তত্ত্বাবধান করেন রাজ্জাক। লাঙ্গলকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাহিমা বেগম বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতে ভবনের তিনটি কক্ষের ছাদ চুইয়ে অঝোরে পানি পড়ে। এ বিষয়ে বহুবার এলজিইডিকে জানানো হয়েছে। সম্প্রতি দায়সারাভাবে ওই ভবনের ছাদ মেরামত করা হয়েছে। তবে এখনো পানি পড়া বন্ধ হয়নি। ’ রায়েরতবক সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শহিদুল ইসলাম নান্টুও একই অভিযোগ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, ইসিআরআরপির অধীনে ২০১৪ সালে সদর উপজেলার গর্জনবুনিয়া সেতু থেকে বাবুগঞ্জ বাজারের একটি আশ্রয়কেন্দ্র সংযোগ সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছিল। এ জন্য মাটির কাজে ১০ লাখ টাকার প্রয়োজন না হলেও সেখানে ৭০ লাখ টাকার ব্যয় প্রাক্কলন তৈরি করেন রাজ্জাক। এ জন্য কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয় তাঁকে। এরপর রহস্যজনক কারণে থেমে যায় পরবর্তী পদক্ষেপ।

এলজিইডি সূত্র জানায়, রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সদর উপজেলার বরগুনা-বাবুগঞ্জ-নিশানবাড়িয়া সড়কের আমতলী স্কুলসংলগ্ন সড়ক সম্প্রসারণের কাজ হয়। কাজ শেষে বিল নিয়ে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলি কনস্ট্রাকশন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমতলী স্কুলের সামনের ১০০ মিটার সড়কে কোনো কাজ না করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন রাজ্জাক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সদর উপজেলার পোটকাখালী-নলী জিসির সড়কে মেইনটেন্যান্স কাজ করা হয়। রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে এখানে ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে সড়কজুড়ে বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয় খানাখন্দ। উঠে যায় কার্পেটিং। এ সড়ক মেরামতের কাজে নিয়মমতো খোয়া দেওয়া হয়নি। পোটকাখালী-নলী সড়কের রিকশাচালক ছগীর মিয়া (৪৫) বলেন, ‘প্রায় এক কোটি টাহা দিয়া রাস্তাডা বানাইননার দুই মাসের মধ্যে এহানে-ওহানে গাতি অইয়া গেছে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয় বছর ধরে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির করছেন প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক। এসব টাকায় তিনি বরগুনার ডিকেপি আবাসিক এলাকায় পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের একতলা একটি বাড়ি করেছেন। বরগুনা পৌর শহর আমতলারপার ও মহাসড়ক এলাকায় মোট চারটি প্লট রয়েছে তাঁর। পটুয়াখালী জেলা শহর ও নিজ বাড়ি মির্জাগঞ্জ উপজেলা শহরে রয়েছে তাঁর একাধিক প্লট। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকার সাভারে কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনেছেন। বরগুনার সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতি মাসে তিনি ফ্ল্যাটের প্রিমিয়াম (টাকা) জমা দেন।

বরগুনা সদর উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক বাবুগঞ্জ বাজারে সংযোগ সড়ক উন্নয়নকাজে প্রক্কলন ব্যয়ে গরমিল হওয়ায় কারণ দর্শানো নোটিশের কথা স্বীকার করেন। লাঙ্গলকাটা আশ্রয়কেন্দ্রের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্মাণের সময় ভবনটির ছাদে একটি ছিদ্র ছিল, যা দিয়ে পানি পড়ত। পরে তা মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। ’ বাঁশবুনিয়া আশ্রয়কেন্দ্রের ছাদে পানি আটকে থাকার কারণে পানি পড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কতিপয় অসাধু ঠিকাদার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। ’

এসব বিষয়ে এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘পোটকাখালী-নলী সড়কের অনিয়মের বিষয় জানি। ওই সড়কের খানাখন্দ মেরামতের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছি। বর্ষা শেষ হলে ঠিকাদার তা মেরামত করে দেবেন। বাঁশবুনিয়া ও লাঙ্গলকাটা আশ্রয়কেন্দ্রে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার কথা শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। ’


মন্তব্য