kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আরিচা ঘাটের ‘রাজা’ ছাত্রলীগ নেতা রেজা

চলছে চাঁদাবাজি ওই নেতাকে ‘দুষ্ট’ বললেন ওসি

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মানিকগঞ্জের আরিচা ঘাটে যাত্রীবাহী ইঞ্জিনচালিত নৌকা আর বাসে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজার নেতৃত্বে চলছে চাঁদাবাজি। প্রকাশ্যে ওই চাঁদাবাজি চললেও পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে ওই নেতাকে ‘দুষ্ট’ আখ্যা দিয়ে পুলিশ বলছে, প্রয়োজনে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর তীরে আরিচা ঘাট এখন ঈদফেরত মানুষের ঢল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যমুনা নদীর অপর পার থেকে প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে আরিচা ঘাটে আসছে অন্তত দেড় শ ট্রলার। প্রতিটি ট্রলার ৭০ থেকে দেড় শ যাত্রী বহন করে। ওই যাত্রীরা আবার আরিচা ঘাট থেকে বিভিন্ন পরিবহনে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে। প্রতিদিন যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে দু্ই-আড়াই শ বাস। স্থানীয় পরিবহনে ওই যাত্রী বহন সম্ভবপর না হওয়ায় বাইরে থেকে বিভিন্ন পরিবহন এসে ভিড় করছে আরিচা ঘাটে। এ সুযোগে শিবালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাাদক সেলিম রেজার নেতৃত্বে চাঁদাবাজি চলছে। এ ক্ষেত্রে ট্রলারপ্রতি আদায় করা হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আর বাসপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

বিভিন্ন সূত্রে কালের কণ্ঠ’র কাছে খবর আসছিল ঈদের দুই দিন পর থকে ওই চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ প্রতিবেদক আরিচা ঘাটে উপস্থিত থেকে এর সত্যতা পায়। অল্প বয়সের ১৫-২০ জন যুবক একেকটি দলে ভাগ হয়ে প্রকাশ্যেই ট্রলার ও বাস থেকে টাকা আদায় করছে। যাত্রীবোঝাই ট্রলার ঘাটে ভিড়তেই চার-পাঁচজন গিয়ে চাঁদা চাইছে। টাকা দিতে না চাইলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে নৌকা ভেঙে ফেলার। একইভাবে যাত্রী বোঝাই হতেই বাসের পথ আটকে চালকের কাছে চাঁদা চাইতে দেখা গেল। নাম ধরে ডাকাডাকির কারণে তাদের কয়েকজনের নাম জয়, সুজন, অনিক, নয়ন, দুলাল, সেলিম বলে জানা গেল। স্থানীয়রা জানায়, এরা সবাই ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত।

শুভযাত্রা পরিবহনের ঢাকা মেট্রো ব-১৫-০৪০৪ নাম্বার গাড়ির চালক বলেন, তিন দিন ধরে তিনি এ লাইনে ঈদফেরত যাত্রী বহন করছেন। ঝামেলা এড়াতে প্রতিদিনই তিনি ৪০০ টাকা হারে চাঁদা দিয়েছেন। তবে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করে তা পুষিয়ে নিয়েছেন। একই কথা বলেন ঢাকা মেট্রো জ-১৯১১ নাম্বার বাসের চালক। তিনি বলেন, চাঁদা দিতে না চাইলে গাড়ি ভাঙচুরসহ মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। এ কারণে বাধ্য হয়ে সবাই চাঁদা দিয়ে দেয়।

নগরবাড়ী ঘাট থেকে প্রায় ১০০ যাত্রী নিয়ে আরিচা ঘাটে এসেছেন ট্রলার চালক লুত্ফর রহমান। অন্য সময় ভাড়া নেন ৫০ টাকা হারে। কিন্তু আরিচা ঘাটে চাঁদাবাজির কারণে ভাড়া নিচ্ছেন ৭০-৮০ টাকা হারে। তিনি বলেন, ‘আরিচা ঘাটে ভিড়লেই পুলাপানগো এক হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে রাজি না হইলে মারধর করা হয়। বাধ্য হয়ে আমরাও ভাড়া বাড়ায়া দিছি। ’ এ ব্যাপারে আরিচা ঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি রাজ্জাক মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করেন। তবে এর সঙ্গে কারা জড়িত, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের নাম বলে এই বুড়ো বয়সে পুলাপানের হাতে মার খাব নাকি। ঘাটে ঘুরলেই এদের দেখতে পাবেন। ’

আরিচা ঘাট যাত্রীসেবা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদ রুবেলও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, তাঁদের পরিবহনের সুপারভাইজারের কাছে কিছু ছেলেপেলে প্রতি ট্রিপে এক হাজার করে চাঁদা দাবি করেছিল। কিন্তু যাত্রীসেবা পরিবহনের সব মালিক একত্রিত হয়ে এর প্রতিবাদ করার পাশাপাশি গাড়ি বন্ধ রাখার কথা বললে ছেলেপেলেরা আর বিরক্ত করেনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবহন স্থানীয়। তাই হয়তো চাঁদাবাজরা সুবিধা করতে পারেনি। তবে বাইরে থেকে যেসব গাড়ি এসেছে, তাদের কাছ থেকে চাঁদা নিতে পারে। ’

অভিযুক্ত শিবালয় থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কেউ কেউ এটা রটাচ্ছে। চাঁদাবাজির সঙ্গে ছাত্রলীগ নয়, স্থানীয় পরিবহন নেতারা জড়িত বলে দাবি করেন তিনি। তবে তিনি তাদের নাম উল্লেখ করতে রাজি হননি। তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতিসহ তিনি শিবালয় থানার ওসির সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে দিয়েছেন, ছাত্রলীগের কেউ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেয়।

শিবালয় থানার ওসি মহম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, সেলিম রেজার নেতৃত্বে চাঁদাবাজির কথা শুনে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তাকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। সেলিম রেজাকে দুষ্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।


মন্তব্য