kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কটিয়াদী

সওজের জলাশয় ভরছেন এমপি

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সওজের জলাশয় ভরছেন এমপি

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর এলাকার বিশাল এই জলাধারটি অনুমোদন ছাড়াই ভরাট করা হচ্ছে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর বাসস্ট্যান্ডে প্রায় এক একর জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। জলাশয়টির মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)।

অনুমোদন ছাড়া এটি ভরাট করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি)। গত মঙ্গলবার থেকে ওই জলাশয়ে বালি ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। এ জন্য নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জলাধার ভরাট নির্বিঘ্ন করতে দাপ্তরিক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া সওজ জলাশয়ের চারপাশে প্রায় দেড় শ দোকানপাট উচ্ছেদ করেছে। এ ছাড়া বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের ৯টি দোকানও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ঈদের আগে উচ্ছেদ করায় ফলমূল ও চা-দোকানিসহ দরিদ্র ব্যবসায়ীরা কার্যত পথে বসেছে।

এর সব করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সরকারদলীয় এমপি অ্যাডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিনের মৌখিক নির্দেশে। তিনি কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে জলাশয়টি ভরাট করছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশাস্ট্যান্ড নির্মাণের কথা বলে জলাধারটি ভরাট করা হলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ, এর মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট বা অন্য কোনোভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। তবে জাতীয় স্বার্থে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে জলাধার সম্পর্কিত বাধানিষেধ শিথিল করা যেতে পারে। ’

অভিযোগ উঠেছে, জলাশয়টি ভরাটের ক্ষেত্রে জাতীয় কোনো স্বার্থ নেই। প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের এ জায়গাটি ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। এ ছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ এ জলাশয়টি যুগ যুগ ধরে অগ্নিনির্বাপণের প্রধান জলাধার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এসব কারণে এলাকাবাসী ক্ষোভে ফুঁসলেও হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না।

কটিয়াদী উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক তানভীরুল হক রাহাত জানান, “গত ২০ আগস্ট জলাশয় ভরাটের বিরোধিতা করে ফেসবুকে লিখেছি, ‘নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী) যেখানে জলাশয় ভরাট নিষেধ করে দিয়ে সংরক্ষণ করতে বলেছেন, সেখানে এমপি কেন ভরাট করছেন জানি না। ’ এ কারণে গত ৭ সেপ্টেম্বর আমাকে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অবশ্য পরদিন আদালত জামিন দেন। ”

গুরুদয়াল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম টিটো বলেন, ‘রাহাতকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পরে রাহাতদের বাসার কাছে পুলিশ মোতায়েন করায় আর বিক্ষোভ হয়নি। ’

এ বিষয়ে কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, ‘পুকুর ভরাটের সঙ্গে চাঁদাবাজি মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ’

এদিকে উচ্ছেদ হওয়া আবুল হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতোই মাসোহারা দিয়ে সেখানে ফল ব্যবসা করতাম। ঈদের আগে দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়ায় পথে বসেছি। এভাবে উচ্ছেদ করায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখন উপোস করতে হচ্ছে। ’

বাসস্ট্যান্ড মসজিদ কমিটির সভাপতি ও কটিয়াদী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নূরুল হক বলেন, ‘উচ্ছেদের কথা শুনে সওজের কর্তাব্যক্তিদের কাছে মসজিদের দোকানগুলো রক্ষার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু ওরা আবেদন অগ্রাহ্য করেছে। এসব ঘর ভাড়া দিয়ে মসজিদের খরচ জোগানো হতো। ’ জলাশয় ভরাট সম্পর্কে প্রবীণ এ ব্যক্তি বলেন, ‘পানির দরকার আছে। জলাশয় ভরাট করা ঠিক হচ্ছে না। ’ এদিকে নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালি তুলতে শুরু করায় একটি স্কুলসহ কয়েকটি সরকারি অফিস-কাছারি হুমকির মুখে রয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, এ জলাশয়টি ভরাটের পর প্রভাবশালীরা কোর্ট ভবনের সামনের দুটি ছোট জলাশয় ভরাট করার পাঁয়তারা করছে।

কটিয়াদীর ইউএনও মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এমপির নির্দেশমতো কাজ হচ্ছে। কেউ সমর্থন করুক বা না করুক। এটা (জলাশয় ভরাট) উনি করবেনই। এ ব্যাপারে উনি ডিটারমাইন্ড (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ)। তাই আমার কমেন্ট (মন্তব্য) করা উচিত না। ’ সওজ বিভাগের কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জলাশয় ভরাটের ব্যাপারে কোনো লিখিত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এটা পুকুর না, নিচু ভূমি। ওটা কোনো কাজে লাগে না। এর গভীরতা তিন-চার ফুটের বেশি না। জনগণের স্বার্থে এমপি টেম্পোস্ট্যান্ড করার জন্য মাটি ভরাট করছেন। ’

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের এমপি মো. সোহরাবউদ্দিন বলেন, ‘এটা জলাশয় না, নিচু জায়গা। এখানে যানজট লেগে থাকে। সিএনজি স্ট্যান্ড করলে জায়গাটি যানজট মুক্ত হয়। তাই সরকারি টাকা দিয়ে এটি করা হচ্ছে। এখানে কোনো দুর্নীতি হচ্ছে না। খারাপ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে না। ’

এ কাজের ক্ষেত্রে অনুমোদনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘একটা গর্তে মাটি ফেলব, এতে অনুমতি নেওয়ার কোনো বিষয় আছে?’ অগ্নিনির্বাপণ ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কটিয়াদীতে সাঁতার কাটার মতো বহু জায়গা আছে। এটা আগুন নেভানোর পানি সংরক্ষণের জায়গা না। ’ জলাশয় সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা কিসের পুকুর। এখান থেকে তো দুর্গন্ধ বের হয়। ’

 


মন্তব্য