kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুই ‘পুতুলকন্যা’

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দুই ‘পুতুলকন্যা’

রুপার বয়স ২৬, মিমের ১৭ বছর। বয়স হলেও তাদের আচরণ ও কথা বলার ভঙ্গি শিশুদের মতোই। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার আঠারোখাদা গ্রামে তাদের বাড়িটি পরিচিত ‘পুতুলবাড়ি’ হিসেবে। বাড়ির আঙিনায় পুতুল খেলায় মেতেছে ওরা দুজন। ছবি : কালের কণ্ঠ

রুপার বয়স ২৬ বছর, মিমের ১৭। বয়স বাড়লেও তাদের উচ্চতা বাড়েনি।

খেলা করে শিশুদের সঙ্গে। আচরণ ও কথা বলে শিশুদের মতো। এ কারণে তারা পুতুলকন্যা হিসেবে পরিচিত। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার আঠারোখাদা গ্রামে তাদের বাড়িটি এলাকায় পুতুলবাড়ি নামে সবাই চেনে।

সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, গ্রামের কৃষক আবদুর রশিদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তাদের মা ফাতেমা খাতুন গৃহিণী। বড় মেয়ে রুপা, ছেলে নূর আলম জিকু (২১) ও ছোট মেয়ে মিম। নূর আলম জিকুর উচ্চতা স্বাভাবিক হলেও রুপা ও মিম খর্বাকৃতির।

ভাই জিকু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র। কিন্তু দুই বোন রুপা ও মিমের লেখাপড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেমে গেছে। বাবা আবদুর রশিদ বলেন, ‘ছোটবেলায় রুপাকে স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। সহপাঠীরা শারীরিক গঠনের কারণে রুপাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকত। মিমের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ফলে, তাদের লেখাপড়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ’

বাবা জানান, ছোটবেলায় যখন বোঝা গেল রুপা স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে না, তার চিকিৎসা করানো হয়। কোনো লাভ হয়নি। মিমের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মিমকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি।

বাবা আরো জানান, ওদের অস্বাভাবিক আকৃতির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এক যুগ আগে থেকে মানুষ তাদের দেখতে আসে। আশা ছিল, সরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য কিছু নিশ্চিত করা হবে। তেমন কিছু হয়নি। তিনি বলেন, ‘রুপার উচ্চতা ৩৪ ইঞ্চি, আর মিমের ৩৩। আমি মনে করি আমার মেয়েদের মতো এত কম উচ্চতার সহোদর বোন পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। ’ তাই গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ডে রুপা ও মিমের নাম দেখতে চান তিনি। এ জন্য জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

শিশুদের মা ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘জন্মের সময় ওরা খুবই ছোট আকৃতির হয়েছিল। বেঁচে থাকবে এ বিশ্বাস কারোরই ছিল না। ছোট মেয়ে মিমের জন্মের পর এ দেশসহ ভারতের ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কিন্তু ওদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ব্যাপারে সবাই নিরাশ করেছেন। ’

প্রতিবেশীরা জানায়, রুপা খুব অভিমানী, রাগি। বায়নাও ধরে খুব। দিনভর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে। আর মোবাইলে শিল্পী মমতাজের গান শোনে। গানের তালে তালে নাচে। ছোট মিমের রাগ-অভিমান অনেক কম। বাড়িতে এই আছে, এই নেই। খেলতে চলে যায় পাড়ায়। অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলা করে আনন্দ পায়।

দুই বোনের খবর জানতে পেরে সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক (ডিসি) সায়মা ইউনুস, সিভিল সার্জন ডা. সিদ্দিকুর রহমান ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজাদ জাহান রুপাদের বাড়ি যান। কথা বলেন, পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে।

গ্রামের সেলিম হোসেন জানান, এ দুই বোনের বয়স যখন অনেক কম তখন থেকে তারা তোতাপাখির মতো ছোট ছোট করে কথা বলে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাদের দেখতে আসে। অনেক মানুষ দেখলে দুই বোন লজ্জা পায়। বড়টা মিটিমিটি হাসে। কথা বললে বোঝে। কেউ কিছু খেতে দিলে লাজুকভাবে তারা তা হাতে নেয়। আচরণ শিশুসুলভ। স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধি আছে। তাদের বয়স বাড়লেও এখনো তারা ছোট্ট মেয়ের মতো বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়ায়।

বাড়াদী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘সরকারিভাবে দুই বোনকে নিয়ে ভাবা দরকার। এখন তাদের বাবা-মা আছেন। তাঁদের অবর্তমানে কে দেখবে এ দুজনকে? তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী এমন কিছু করা দরকার—যাতে তারা নিশ্চিন্তে জীবন কাটাতে পারে। ’

বাড়াদী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তোবারক হোসেন বলেন, ‘রুপা প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। মিমও যাতে পায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। ’

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘তাদের সমস্যা জন্মগত। পরীক্ষা না করে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে তাদের সমস্যার সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তার পরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। ’

চুয়াডাঙ্গার ডিসি সায়মা ইউনুস বলেন, ‘রুপা ও মিমের চেয়ে উচ্চতায় ছোট নেপাল ও ভারতে আছে। তবে, দুই বোন খর্বাকৃতিতে তারা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট। এ বিষয়ে আমরা দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানাব। ’


মন্তব্য